নাস্তিকতা কাকে বলে?

“নাস্তিক” শব্দটা নিয়ে যত তর্ক হয়, তার সিংহভাগই আসলে সংজ্ঞা নিয়ে গোলমাল। একজন বলেন, নাস্তিক মানে যে জোর গলায় ঘোষণা করে “ঈশ্বর বলে কিছু নেই”। আরেকজন বলেন, নাস্তিক মানে যে শুধু ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না। দুটো কিন্তু এক জিনিস নয়। একটা হলো নির্দিষ্ট দাবি করা, আর অন্যটা হলো একটা দাবি মেনে না নেওয়া। এই দুইয়ের ফারাক না বুঝলে গোটা আলোচনাটাই ভুল পথে চলে যায়। তাই কে ঠিক আর কে ভুল, সেই তর্কে ঢোকার আগে পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার, আমরা ঠিক কোন জিনিসটার কথা বলছি।

এই লেখার উদ্দেশ্য নাস্তিকতা প্রমাণ করা নয়, আস্তিকতা খণ্ডন করাও নয়। উদ্দেশ্য শুধু একটাই, শব্দটা আসলে কী বোঝায়, তার ভেতরে কয় রকমের অবস্থান আছে, কোন প্রশ্নের সঙ্গে এর সম্পর্ক আর কোন প্রশ্নের সঙ্গে নেই, সেটা গুছিয়ে বলা। একটা অবস্থান সত্য কি মিথ্যা, সেই বিচারে যাওয়ার আগে অবস্থানটা কী সেটা এটুকু স্পষ্ট করা জরুরি।

শব্দটা কোথা থেকে এলো

“নাস্তিক” শব্দটার বাংলা উৎস সংস্কৃত — “ন অস্তি” অর্থাৎ “নেই”, তার থেকে “নাস্তি”, আর যে “নাস্তি” বলে সে “নাস্তিক”। মজার ব্যাপার হলো, ইংরেজি “atheism” শব্দটার গঠনও প্রায় হুবহু একই যুক্তিতে দাঁড়িয়ে। এটি এসেছে গ্রিক শব্দ átheos (ἄθεος) থেকে, যেখানে a- মানে “ছাড়া / বিহীন” আর theos (θεός) মানে “দেবতা” বা “ঈশ্বর”। অর্থাৎ আক্ষরিক অর্থে “ঈশ্বরবিহীন”। খেয়াল করার মতো ব্যাপার, এই উপসর্গ a- মানে কিন্তু “বিরুদ্ধে” নয়; “বিরুদ্ধে” বোঝাতে গ্রিকে আলাদা উপসর্গ ছিল anti-। তাই শব্দটার গোড়াতেই কোনো আক্রমণাত্মক ভাব নেই; আছে শুধু অনুপস্থিতির ইঙ্গিত, বিশ্বাসের অনুপস্থিতি।

প্রাচীন গ্রিসে átheos শব্দটা প্রথমে ছিল একটা গালি, যাকে “অধার্মিক” বা “দেবতাদের অস্বীকারকারী” বলে দোষ দেওয়া হতো, তাকেই এই নামে ডাকা হতো। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে এসে এর মানে খানিকটা সক্রিয় হয় “দেবতাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নকারী” এই অর্থে। ইংরেজিতে “atheism” শব্দটা ঢোকে ষোড়শ শতকে, ফরাসি athéisme হয়ে; অভিধান-ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী এর প্রথম ইংরেজি ব্যবহার ১৫৮৭ সালের কাছাকাছি। তবে একটা কথা মনে রাখা দরকার, অষ্টাদশ শতকের আগে পর্যন্ত কেউ নিজেকে গর্ব করে “নাস্তিক” বলত না; শব্দটা ছিল বিশুদ্ধ অপবাদ, অন্যের গায়ে সাঁটানোর তকমা। নিজের পরিচয় হিসেবে “নাস্তিক” শব্দটা মানুষ গ্রহণ করতে শুরু করে অনেক পরে।

তার মানে অবশ্য এই নয় যে নাস্তিক্য-ধরনের চিন্তা আধুনিক আবিষ্কার। শব্দটা নতুন হলেও চিন্তাটা অতি প্রাচীন। ভারতেই ছিল চার্বাক বা লোকায়ত দর্শন, যারা বেদের প্রামাণ্যতা, পরলোক আর অদৃশ্য সত্তা অস্বীকার করে শুধু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎকেই বাস্তব বলে মানত। গ্রিসে ডেমোক্রিটাস আর এপিকিউরাসের বস্তুবাদী চিন্তা, কিংবা মেলোসের ডায়াগোরাস এঁরা সবাই ঈশ্বরকেন্দ্রিক ব্যাখ্যা ছাড়াই জগৎকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। অর্থাৎ “ঈশ্বর ছাড়া জগৎ ব্যাখ্যা করা যায় কি না” এই প্রশ্নটা মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে করে আসছে।

মূল সংজ্ঞা:

“নাস্তিকতা” শব্দটার দুটো আলাদা ব্যবহার আছে, আর বেশিরভাগ তর্ক বাধে এই দুটোকে গুলিয়ে ফেলার কারণে। দার্শনিকরা একে বলেন শব্দটির “বহুরূপতা” (polysemy)।

প্রথম অর্থ — মনস্তাত্ত্বিক অর্থে: এখানে নাস্তিকতা হলো একটা মানসিক অবস্থা, নির্দিষ্ট করে বললে “ঈশ্বরে বিশ্বাসের অনুপস্থিতি”। আস্তিক মানে যে বিশ্বাস করে ঈশ্বর আছে; আর নাস্তিক মানে সহজভাবে, যে আস্তিক নয়। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী নাস্তিক কোনো দাবি করছে না, সে শুধু আস্তিকের দাবিটা গ্রহণ করছে না।

দ্বিতীয় অর্থ — দার্শনিক বা প্রস্তাবনামূলক অর্থে: দর্শনের প্রথাগত ব্যবহারে “নাস্তিকতা” একটা মানসিক অবস্থা নয়, বরং একটা প্রস্তাবনা বা দাবি — “ঈশ্বর নেই”। এই অর্থে নাস্তিক সেই ব্যক্তি, যে সক্রিয়ভাবে মনে করে ঈশ্বরের অস্তিত্ব মিথ্যা। দার্শনিক উইলিয়াম রো-র ভাষায়, নাস্তিকতা হলো “সেই অবস্থান যা ঈশ্বরের অনস্তিত্ব দাবি করে; এটি নিছক বিশ্বাস স্থগিত রাখা নয়, বরং সক্রিয় অবিশ্বাস।” Cambridge Dictionary of Philosophy-ও জানাচ্ছে, দর্শনে এই কঠোর অর্থটাই মানসম্মত (standard) — যেখানে নাস্তিকতা মানে “কোনো ঈশ্বর নেই এই বিশ্বাস।”

তাহলে দাঁড়াল দুটো ছবি। একদিকে “বিশ্বাস করি না” (অনুপস্থিতি), অন্যদিকে “বিশ্বাস করি যে নেই” (দাবি)। এই ফারাকটা তুচ্ছ নয়, বরং গোটা বিতর্কের কেন্দ্র। কারণ কে কোন দাবির জন্য প্রমাণ দিতে বাধ্য, সেটা নির্ভর করে ঠিক কোন অর্থে “নাস্তিক” শব্দটা ব্যবহার হচ্ছে তার উপর।

নাস্তিকতার প্রকারভেদ

উপরের দুই অর্থকে দার্শনিকরা আরও গুছিয়ে দুই জোড়া শ্রেণিতে ভাগ করেন। জোড়া দুটো আলাদা, কিন্তু পরস্পর সম্পর্কিত।

এক · দুর্বল বনাম শক্তিশালী (নেতিবাচক বনাম ইতিবাচক)

এই ভাগটা এসেছে অ্যান্টনি ফ্লু, মাইকেল মার্টিন প্রমুখ দার্শনিকদের হাত ধরে।

দুর্বল বা নেতিবাচক নাস্তিকতা মানে শুধু ঈশ্বরে বিশ্বাসের অভাব — “আমার কাছে ঈশ্বরের অস্তিত্বের যথেষ্ট প্রমাণ নেই, তাই আমি বিশ্বাস করি না।” এখানে “ঈশ্বর নেই” — এমন কোনো দাবি করা হচ্ছে না।

শক্তিশালী বা ইতিবাচক নাস্তিকতা মানে সরাসরি দাবি করা — “ঈশ্বর নেই।” এটা শুধু বিশ্বাসের অভাব নয়, বরং একটা নির্দিষ্ট অবস্থান, যার পক্ষে যুক্তি-প্রমাণ দেওয়া যায় এবং দেওয়া দরকারও।

দুই · প্রচ্ছন্ন বনাম প্রকাশ্য

এই ভাগটা করেছেন জর্জ এইচ. স্মিথ, তাঁর Atheism: The Case Against God (১৯৭৯) বইয়ে। স্মিথের সংজ্ঞায়:

প্রচ্ছন্ন নাস্তিকতা — “সচেতনভাবে অস্বীকার না করেই ঈশ্বরবিশ্বাসের অনুপস্থিতি।” যে ঈশ্বরের ধারণার সঙ্গেই পরিচিত নয়, সে এই অর্থে নাস্তিক। যেমন সদ্যোজাত শিশু, কিংবা যে সমাজে ঈশ্বরের ধারণাই পৌঁছায়নি সেখানকার মানুষ। অস্বীকার করতে হলে আগে জানতে হয় কী অস্বীকার করছি, সেই জ্ঞানটাই যার নেই, সে কিছু অস্বীকারও করছে না, শুধু বিশ্বাসও করছে না।

প্রকাশ্য নাস্তিকতা — “সচেতন প্রত্যাখ্যানের ফলে ঈশ্বরবিশ্বাসের অনুপস্থিতি।” অর্থাৎ যে ব্যক্তি ঈশ্বরের ধারণা বুঝেছে, ভেবেছে, এবং শেষে বিশ্বাস না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

স্মিথের মূল কথাটা তাৎপর্যপূর্ণ — নাস্তিক, সে প্রচ্ছন্ন হোক বা প্রকাশ্য, “কোনো কিছুর অস্তিত্ব দাবি করে না; সে কোনো ইতিবাচক বিবৃতি দেয় না।” নাস্তিকতার কেন্দ্রে আছে শুধু একটাই জিনিস, ঈশ্বরবিশ্বাসের অনুপস্থিতি। কেন সেই বিশ্বাস অনুপস্থিত (না জানার কারণে, নাকি ভেবেচিন্তে প্রত্যাখ্যানের কারণে) শুধু সেটুকুই বিভিন্ন নাস্তিক অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়।

নাস্তিকতা বনাম অজ্ঞেয়বাদ

এখানে একটা বহুল-প্রচলিত ভুল বোঝাবুঝি পরিষ্কার করা দরকার। অনেকেই ভাবেন, আস্তিকতা আর নাস্তিকতার মাঝখানে একটা নিরাপদ তৃতীয় অবস্থান হলো অজ্ঞেয়বাদ (agnosticism) — যার অর্থ “আমি জানি না।” কিন্তু ব্যাপারটা আসলে এত সরল নয়, কারণ নাস্তিকতা আর অজ্ঞেয়বাদ দুটো ভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেয়।

শব্দটা তৈরি করেছিলেন জীববিজ্ঞানী টি. এইচ. হাক্সলি, ১৮৬৯ সালে। তাঁর কাছে অজ্ঞেয়বাদী সেই ব্যক্তি, যে “ঈশ্বর আছেন” এই প্রস্তাবনা বিবেচনা করেছে, কিন্তু একে সত্যও বলে না, মিথ্যাও বলে না। মূল কথাটা হলো —

  • নাস্তিকতা/আস্তিকতা — এটা বিশ্বাস সম্পর্কিত প্রশ্ন: তুমি কি ঈশ্বরে বিশ্বাস করো?
  • অজ্ঞেয়বাদ/জ্ঞেয়বাদ — এটা জ্ঞান সম্পর্কিত প্রশ্ন: তুমি কি জানো (নিশ্চিতভাবে) ঈশ্বর আছেন কি নেই?

এই দুটো ভিন্ন অক্ষ হওয়ায় এদের মিশিয়ে চার রকম অবস্থান দাঁড়ায়। কেউ হতে পারে “অজ্ঞেয়বাদী নাস্তিক” — “আমি নিশ্চিত করে জানি না ঈশ্বর আছেন কি না, তবে যথেষ্ট প্রমাণ পাইনি বলে বিশ্বাস করি না।” আবার কেউ হতে পারে “অজ্ঞেয়বাদী আস্তিক” — “নিশ্চিত করে জানি না, তবু বিশ্বাস করি।” তাই “আমি জানি না” বলাটা নাস্তিকতা থেকে বেরিয়ে যাওয়া নয়; বরং অধিকাংশ চিন্তাশীল নাস্তিক এই অর্থে অজ্ঞেয়বাদীই, তাঁরা পরম নিশ্চয়তার দাবি করেন না, শুধু বলেন প্রমাণের অভাবে বিশ্বাসটা তাঁরা ধরে রাখতে পারছেন না।

এর পাশাপাশি আরও দুটো শব্দ চলে আসে। ধর্মবিরোধিতা (antitheism) — শুধু অবিশ্বাস নয়, বরং সক্রিয়ভাবে ধর্ম বা ঈশ্বরবিশ্বাসকে ক্ষতিকর মনে করা; এটা নাস্তিকতার একটা বিশেষ, বাড়তি অবস্থান, সব নাস্তিকের ক্ষেত্রে খাটে না। আর উদাসীনতাবাদ (apatheism) — প্রশ্নটা সত্য না মিথ্যা, তা নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজনই বোধ না করা।

প্রমাণের দায় কার?

এবার আসি সবচেয়ে বিতর্কিত প্রশ্নে — কে প্রমাণ দিতে বাধ্য? অ্যান্টনি ফ্লু তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ The Presumption of Atheism (১৯৭৬)-এ যুক্তি দিয়েছিলেন, ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে যেকোনো আলোচনা শুরু হওয়া উচিত অবিশ্বাসকে “ডিফল্ট” বা প্রারম্ভিক অবস্থান ধরে নিয়ে, ঠিক যেভাবে আদালতে অভিযুক্তকে দোষী প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ ধরে নেওয়া হয়। এখানে যুক্তিটা হলো: যে ব্যক্তি একটা ইতিবাচক দাবি করছে (“ঈশ্বর আছেন”), প্রমাণের দায় তার; যে শুধু দাবিটা গ্রহণ করছে না, তার উপর প্রমাণের কোনো দায় বর্তায় না।

এই ধারণাটা বোঝাতে বার্ট্রান্ড রাসেল একটা বিখ্যাত উপমা দিয়েছিলেন, মহাকাশে একটা কল্পিত চায়ের কেটলি। যদি আমি দাবি করি, পৃথিবী আর মঙ্গলের মাঝখানে একটা ছোট্ট চিনামাটির কেটলি সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে, আর সেটা এত ছোট যে কোনো টেলিস্কোপে ধরা পড়ে না — তাহলে “প্রমাণ করে দেখাও কেটলিটা নেই” বলে আমি অন্যদের ঘাড়ে দায় চাপাতে পারি না। দায়টা আমারই, যে অস্বাভাবিক দাবিটা করছি। রাসেলের মূল কথা: যে দাবি করে, প্রমাণের ভার তার, অনুপস্থিতি প্রমাণ করা অস্বীকারকারীর কাজ নয়।

তবে এখানে একটা সূক্ষ্ম কিন্তু জরুরি কথা আছে, যেটা সৎভাবে স্বীকার করা দরকার — এই “প্রমাণের দায় প্রতিপক্ষের” যুক্তি কেবল দুর্বল/নেতিবাচক নাস্তিকতার ক্ষেত্রে খাটে। যে ব্যক্তি শক্তিশালী নাস্তিক, অর্থাৎ সরাসরি দাবি করে “ঈশ্বর নেই”, তার উপরও কিন্তু প্রমাণের দায় বর্তায়, কারণ সেও একটা ইতিবাচক দাবি করছে। “আমি শুধু বিশ্বাস করি না” আর “আমি দাবি করি নেই” এই দুইয়ের সুবিধা একসঙ্গে ভোগ করা যায় না। এই সততাটুকু নাস্তিক পক্ষেরও রক্ষা করা উচিত।

কয়েকটি প্রচলিত ভুল ধারণা

নাস্তিকতা নিয়ে কিছু ভুল ধারণা এত গভীরভাবে গেঁথে আছে যে সেগুলো আলাদা করে ভাঙা দরকার।

এক — নাস্তিকতা মানে “নিশ্চিতভাবে জানি ঈশ্বর নেই” নয়। আগেই বলা হয়েছে, বেশিরভাগ নাস্তিক পরম নিশ্চয়তার দাবি করেন না। তাঁরা প্রমাণের অভাবে বিশ্বাস স্থগিত রাখেন, এটা দম্ভ নয়, বরং প্রমাণের প্রতি এক ধরনের সততা।

দুই — নাস্তিকতা কোনো ধর্ম নয়। কেউ কেউ বলেন, “নাস্তিকতাও তো একটা বিশ্বাস।” কিন্তু বিশ্বাস না করা-কে বিশ্বাস বলা আর টাক-কে চুলের রং বলার মধ্যে ফারাক নেই। নাস্তিকতা কোনো ধর্মগ্রন্থ, উপাসনা, নৈতিক বিধান বা প্রতিষ্ঠান নিয়ে আসে না, এটা একটামাত্র প্রশ্নের একটামাত্র উত্তর।

তিন — নাস্তিকতা মানে একটা পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন নয়। নাস্তিকতা শুধু “ঈশ্বরে বিশ্বাস করো কি না” — এই একটি প্রশ্নেরই উত্তর। এটা নীতিশাস্ত্র, রাজনীতি বা জীবনের অর্থ নিয়ে কিছু বলে না। একজন নাস্তিক হতে পারেন মানবতাবাদী, আবার আরেকজন হতে পারেন সম্পূর্ণ ভিন্ন মতের। বস্তুবাদ, ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদ, সংশয়বাদ — এসব নাস্তিকতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু নাস্তিকতার অংশ নয়।

চার — নাস্তিকতা মানে অনৈতিকতা বা “শয়তানপূজা” নয়। শয়তানে বিশ্বাস করতে হলে আগে অতিপ্রাকৃত সত্তায় বিশ্বাস করতে হয়, যা নাস্তিক করে না। আর নৈতিকতা? মানুষ ধর্মের বহু আগে থেকেই সমাজবদ্ধ, সহযোগিতাপ্রবণ প্রাণী; নীতিবোধের উৎস নিয়ে দার্শনিক তর্ক থাকলেও, “ঈশ্বরে বিশ্বাস না করলে নীতিবোধ থাকে না” এমন কোনো যুক্তিসিদ্ধ ভিত্তি নেই।

বিপক্ষের সবচেয়ে জোরালো আপত্তিটা কী

সততার খাতিরে এবার উল্টো দিকের সবচেয়ে শক্তিশালী আপত্তিটা তুলে ধরা দরকার, কারণ সেটা একেবারে ফেলনা নয়। দার্শনিক উইলিয়াম লেন ক্রেইগ-সহ অনেক আস্তিক চিন্তক যুক্তি দেন নাস্তিকতাকে নিছক “বিশ্বাসের অভাব” হিসেবে সংজ্ঞায়িত করাটা আসলে একটা কৌশল, প্রমাণের দায় এড়ানোর পথ। তাঁদের বক্তব্য: যদি নাস্তিকতা মানে শুধুই বিশ্বাসের অনুপস্থিতি হয়, তাহলে তো পাথর, গাছ, সদ্যোজাত শিশু, এরাও “নাস্তিক”, কারণ এদের কারোরই ঈশ্বরবিশ্বাস নেই। এভাবে সংজ্ঞাটা এত প্রশস্ত হয়ে পড়ে যে শব্দটা প্রায় অর্থহীন হয়ে যায়। তাঁদের মতে, “নাস্তিকতা” শব্দটার একটা দার্শনিক অবস্থান বোঝানো উচিত, “ঈশ্বর নেই” যার পক্ষে যুক্তি দিতে হবে, ঠিক যেমন আস্তিককে তার অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিতে হয়।

এই আপত্তির একটা সত্যিকারের জোর আছে, আর তা অস্বীকার করা অসততা হবে। প্রকৃতপক্ষে দর্শনের প্রথাগত ব্যবহারে “নাস্তিকতা” মানে ঐ প্রস্তাবনামূলক দাবিটাই, এবং সেই কারণেই এটা যুক্তি দিয়ে যাচাই করা সম্ভব। একটা মানসিক অবস্থাকে যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করা যায় না, কিন্তু একটা দাবিকে যায়। তাই ন্যায্য কথাটা হয়তো এই, নাস্তিক পক্ষের নিজেরই স্পষ্ট থাকা দরকার, সে কোন অর্থে “নাস্তিক” বলছে। যদি সে শুধু বিশ্বাস স্থগিত রাখে, তবে সেটা এক জিনিস; আর যদি সে “ঈশ্বর নেই” দাবি করে, তবে সেই দাবির পক্ষে যুক্তি হাজির করার দায়িত্বও তারই। দুই নৌকায় পা রেখে সুবিধাজনক সময়ে সুবিধাজনক সংজ্ঞায় সরে যাওয়াটা বৌদ্ধিক সততার পরিপন্থী, এই সমালোচনাটুকু গ্রহণ করে নেওয়াই ভালো।


তথ্যসূত্র

[১] শব্দের উৎপত্তি: Online Etymology Dictionary, “atheism”; ও Oxford English Dictionary — গ্রিক ἄθεος (átheos: ἀ- “বিহীন” + θεός “ঈশ্বর”) → ফরাসি athéisme → ইংরেজি, প্রথম প্রয়োগ ~১৫৮৭।

[২] Draper, Paul, “Atheism and Agnosticism”, The Stanford Encyclopedia of Philosophy — নাস্তিকতার মনস্তাত্ত্বিক বনাম প্রস্তাবনামূলক অর্থ; এবং Pojman, L. (ed.), Cambridge Dictionary of Philosophy, “atheism”।

[৩] Rowe, William L., “Atheism”, Concise Routledge Encyclopedia of Philosophy (2000), পৃ. ৬২।

[৪] Martin, Michael, Atheism: A Philosophical Justification (1990); নেতিবাচক/ইতিবাচক (দুর্বল/শক্তিশালী) নাস্তিকতার পার্থক্য প্রসঙ্গে Flew, Martin ও Rowe।

[৫] Smith, George H., Atheism: The Case Against God (1979), পৃ. ১৩–১৮ — প্রচ্ছন্ন ও প্রকাশ্য নাস্তিকতা।

[৬] Huxley, T. H. (১৮৬৯) — “agnostic” শব্দের প্রবর্তন; দ্রষ্টব্য Draper, “Atheism and Agnosticism”, Stanford Encyclopedia of Philosophy

[৭] Flew, Antony, “The Presumption of Atheism” (1976) — প্রমাণের দায় ও ডিফল্ট অবস্থান হিসেবে অবিশ্বাস।

Posted in

Leave a comment