ইসলামকে প্রায়ই “শান্তির ধর্ম” বলা হয়। মুহাম্মদকে বলা হয় “রহমাতুল্লিল আলামিন” বিশ্বজগতের জন্য করুণা (কুরআন ২১:১০৭) এবং মানবজাতির জন্য “উসওয়াতুন হাসানা” বা সর্বোত্তম আদর্শ (কুরআন ৩৩:২১)। কিন্তু ইসলামের নিজস্ব প্রাথমিক উৎসগুলো, সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, ইবনে ইসহাকের সিরাত, ওয়াকিদির কিতাবুল মাগাজি, ইবনে সা’দের তাবাকাত এবং তাবারির ইতিহাস ভিন্ন এক চিত্র তুলে ধরে। এসব গ্রন্থে অন্তত পাঁচজন মানুষের হত্যার বর্ণনা আছে, যাদের প্রধান অপরাধ ছিল কথায় বা কবিতায় মুহাম্মদের সমালোচনা। তারা নিহত হয়েছেন হয় মুহাম্মদের সরাসরি আহ্বানে, নয়তো তার পরবর্তী অনুমোদনে।
নিহতদের মধ্যে আছেন একজন অতিবৃদ্ধ কবি, সন্তানদের পাশে ঘুমন্ত এক মা এবং এক অন্ধ ব্যক্তির গর্ভবতী দাসী। হত্যার পদ্ধতি ছিল ছলনা, বন্ধুত্বের ভান আর রাতের অন্ধকারে গোপন আক্রমণ। কোনো ক্ষেত্রেই অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি।
আবু আফাক: ঘুমন্ত বৃদ্ধ কবি
আবু আফাক ছিলেন মদিনার বনু আমর ইবনে আওফ গোত্রের এক অতিবৃদ্ধ কবি; ওয়াকিদি ও ইবনে সা’দ তাকে ইহুদি এবং ১২০ বছর বয়সী বলে উল্লেখ করেছেন। তার অপরাধ ছিল ব্যঙ্গাত্মক কবিতা, যেখানে তিনি মদিনাবাসীকে এক বহিরাগতের কথায় নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হওয়ার জন্য তিরস্কার করেছিলেন।
ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় মুহাম্মদ বলেন, “কে আমার হয়ে এই দুর্বৃত্তের ব্যবস্থা করবে?” সালিম ইবনে উমাইর নামে এক সাহাবি দায়িত্ব নেন। ইবনে সা’দের বর্ণনা অনুযায়ী, গরমের রাতে আবু আফাক বাড়ির আঙিনায় ঘুমিয়ে ছিলেন; সালিম তার কলিজায় তলোয়ার রেখে এমনভাবে চাপ দেন যে তা বিছানা পর্যন্ত পৌঁছে যায় (সিরাত ইবনে ইসহাক, পৃ. ৬৭৫; তাবাকাত, খণ্ড ২, পৃ. ৩০–৩১)।
আসমা বিনতে মারওয়ান: সন্তানদের মাঝে নিহত মা
আসমা বিনতে মারওয়ান ছিলেন মদিনার একজন নারী কবি। ইবনে ইসহাক তাকে বনু উমাইয়া ইবনে যায়েদ গোত্রের সদস্য এবং ইয়াজিদ ইবনে যায়েদ আল-খাতমির স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন, অর্থাৎ তিনি ইহুদি নন, মদিনার আওস গোত্রীয় আরব। আবু আফাক নিহত হওয়ার পর তিনি কবিতায় মদিনাবাসীকে ধিক্কার দেন, কারণ তারা এক বহিরাগতকে নিজেদের নেতা মেনে নিয়েছে। ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় মুহাম্মদ বলেন, “কে আমাকে মারওয়ানের মেয়ের হাত থেকে রেহাই দেবে?” ওয়াকিদি ও ইবনে সা’দ আরেকটি তথ্য যোগ করেন: আসমার নিজ গোত্রের অন্ধ (বা ক্ষীণদৃষ্টি) সাহাবি উমাইর ইবনে আদি মানত করেছিলেন, মুহাম্মদ বদর থেকে নিরাপদে ফিরলে তিনি আসমাকে হত্যা করবেন।
রাতে উমাইর আসমার ঘরে ঢোকেন। তার সন্তানেরা চারপাশে ঘুমিয়ে ছিল, একটি শিশু বুকের দুধ খাচ্ছিল। উমাইর হাতড়ে শিশুটিকে সরিয়ে দেন, তারপর আসমার বুকে তলোয়ার এমনভাবে বিঁধিয়ে দেন যে তা পিঠ ভেদ করে বেরিয়ে যায়। ভোরে ফজরের নামাজের পর মুহাম্মদ জিজ্ঞেস করেন, “তুমি কি মারওয়ানের মেয়েকে হত্যা করেছ?” উমাইর হ্যাঁ বলে জানতে চান, এর জন্য তার কোনো দায় আছে কি না। মুহাম্মদের উত্তর: “এ নিয়ে দুটি ছাগলও শিং ঠোকাঠুকি করবে না”, অর্থাৎ এই মৃত্যুর কোনো পরিণতি নেই, কেউ প্রতিশোধ চাইবে না। ইবনে সা’দের বর্ণনায়, কেউ উমাইরকে “অন্ধ” বললে মুহাম্মদ বলেন, তাকে অন্ধ নয়, “বাসির” (দৃষ্টিমান) বলো (সিরাত ইবনে ইসহাক, পৃ. ৬৭৫–৬৭৬; তাবাকাত, খণ্ড ২, পৃ. ৩০–৩১)।
কা’ব ইবনুল আশরাফ: অনুমোদিত প্রতারণা
কা’ব ইবনুল আশরাফ ছিলেন মদিনার প্রভাবশালী কবি ও ধনী ব্যক্তি; তার বাবা ছিলেন তাঈ গোত্রের আরব, মা বনু নাদির ইহুদি গোত্রের। বদর যুদ্ধে কুরাইশ নেতাদের মৃত্যুর পর তিনি মক্কায় গিয়ে তাদের জন্য শোকগাথা রচনা করেন ও প্রতিশোধে উস্কানি দেন; মদিনায় ফিরে মুসলিম নারীদের নিয়ে প্রেমের কবিতাও লেখেন (সিরাত ইবনে ইসহাক, পৃ. ৩৬৪–৩৬৫)।
সহিহ বুখারি (৪০৩৭; আরও ২৫১০, ৩০৩১, ৩০৩২) এবং সহিহ মুসলিমে (১৮০১) বর্ণিত হয়েছে, মুহাম্মদ বলেন: “কা’ব ইবনুল আশরাফের দায়িত্ব কে নেবে? সে আল্লাহ ও তার রাসুলকে কষ্ট দিয়েছে।” মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা জিজ্ঞেস করেন, “আপনি কি চান আমি তাকে হত্যা করি?” উত্তর আসে, “হ্যাঁ।” তখন ইবনে মাসলামা বলেন, “তাহলে আমাকে কিছু কথা বলার অনুমতি দিন”, অর্থাৎ কা’বের বিশ্বাস অর্জনের জন্য মুহাম্মদের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলার অনুমতি। মুহাম্মদ বলেন, “বলো।”
পরিকল্পনা অনুযায়ী ইবনে মাসলামা কা’বের কাছে গিয়ে অভিযোগ করেন, “এই লোকটি” সদকা চেয়ে চেয়ে তাদের কষ্টে ফেলেছে, এবং খাদ্যশস্য ধার চান। জামানত হিসেবে অস্ত্র বন্ধক রাখার প্রস্তাব দেন, যাতে রাতে সশস্ত্র অবস্থায় আসা সন্দেহজনক না হয়। রাতে তিনি আসেন আবু নায়েলাকে নিয়ে, যিনি ছিলেন কা’বের দুধভাই; সঙ্গে ছিলেন আবু আবস ইবনে জাবর, হারিস ইবনে আওস ও আব্বাদ ইবনে বিশর।
কা’বের স্ত্রী সতর্ক করেছিলেন, তিনি এমন এক কণ্ঠ শুনছেন যেন তা থেকে রক্ত ঝরছে। কা’ব জবাব দেন, সম্মানিত মানুষকে রাতে বর্শার আঘাতের জন্য ডাকা হলেও সে সাড়া দেয়। কা’ব নেমে এলে ইবনে মাসলামা তার সুগন্ধির প্রশংসা করে মাথার ঘ্রাণ নেওয়ার অনুমতি চান, তারপর চুল শক্ত করে ধরে সঙ্গীদের বলেন, “আঘাত করো” এবং তারা তাকে হত্যা করে। এরপর তারা ফিরে এসে মুহাম্মদকে খবর দেন। ইবনে সা’দের বর্ণনায় আরও আছে, তারা কা’বের কাটা মাথা মুহাম্মদের সামনে ফেলে দেন এবং তিনি হত্যার জন্য আল্লাহর প্রশংসা করেন।
পরদিন সকালের বর্ণনা আরও উদ্বেগজনক। ইবনে ইসহাক লিখেছেন, মুহাম্মদ ঘোষণা দেন: “ইহুদিদের মধ্যে যাকেই তোমরা হাতের কাছে পাও, হত্যা করো।” এরপর মুহাইয়িসা ইবনে মাসউদ নামে এক সাহাবি ইবনে সুনাইনা নামের এক ইহুদি ব্যবসায়ীকে হত্যা করেন, যার সঙ্গে তার ব্যবসায়িক ও সামাজিক সম্পর্ক ছিল (সিরাত ইবনে ইসহাক, পৃ. ৩৬৯)।
আবু রাফে: মর্যাদার প্রতিযোগিতায় হত্যা
আবু রাফে সাল্লাম ইবনে আবিল হুকাইক ছিলেন বনু নাদির গোত্রের নেতা ও ধনী ব্যবসায়ী, যিনি মদিনা থেকে বিতাড়নের পর খায়বারের দুর্গে বাস করতেন। সহিহ বুখারিতে (৪০৩৯; আরও ৩০২২, ৩০২৩, ৪০৩৮, ৪০৪০) বলা হয়েছে, তিনি মুহাম্মদকে কষ্ট দিয়েছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে শত্রুদের সাহায্য করতেন।
ইবনে ইসহাক এই হত্যার একটি চমকপ্রদ প্রেক্ষাপট দিয়েছেন। মদিনার দুই আনসার গোত্র আওস ও খাযরাজ মুহাম্মদের কাছে মর্যাদা অর্জনে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করত। আওস গোত্রের লোকেরা কা’বকে হত্যা করায় খাযরাজ গোত্রও সমান কৃতিত্ব চাইল; কা’বের মতো শত্রুতা আর কার আছে খুঁজে তারা আবু রাফের নাম পেল এবং মুহাম্মদের অনুমতি নিল (সিরাত ইবনে ইসহাক, পৃ. ৪৮২–৪৮৩)।
বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী আবদুল্লাহ ইবনে আতিকের নেতৃত্বে একটি দল খায়বারে যায়। সন্ধ্যায় আবদুল্লাহ কাপড়ে নিজেকে ঢেকে প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারার ভান করে দুর্গ-ফটকের কাছে বসে থাকেন; দারোয়ান তাকে দুর্গের লোক ভেবে ভেতরে ডেকে নেয়। (আরেকটি বর্ণনায় দুর্গের লোকেরা হারানো গাধা খুঁজতে বের হলে তিনি তাদের দলে মিশে যান।) রাতে তিনি খুঁটিতে ঝোলানো চাবি নিয়ে একটির পর একটি দরজা খোলেন এবং পেছন থেকে বন্ধ করে দেন, যাতে কেউ সাহায্যে আসতে না পারে।
অন্ধকার ঘরে তিনি “আবু রাফে” নাম বলে ডাকেন এবং আঘাত করেন। তারপর সেই হত্যাকারী সাহায্যকারীর ভান ধরে আবু রাফের কাছে যান এবং আহত আবু রাফেকে শনাক্ত করে আবার আঘাত করেন। শেষে তলোয়ারের ডগা পেটে ঢুকিয়ে পিঠ পর্যন্ত চাপ দেন।
অন্ধ ব্যক্তির দাসী: “তার রক্ত মূল্যহীন”
এই ঘটনাটি এসেছে সুনানে আবু দাউদ (৪৩৬১) ও সুনানে নাসাঈ (৪০৭০) থেকে, ইকরিমার সূত্রে ইবনে আব্বাসের বর্ণনায়; এক অন্ধ ব্যক্তির একজন উম্মে ওয়ালাদ ছিল, অর্থাৎ এমন দাসী, যে তার মালিকের সন্তানের মা। এই নারী মুহাম্মদকে গালি দিতেন ও নিন্দা করতেন; মালিক বারবার নিষেধ করলেও তিনি থামেননি।
এক রাতে তিনি আবার নিন্দা শুরু করলে অন্ধ লোকটি একটি ছোরা নিয়ে তার পেটে রাখেন এবং ভর দিয়ে চেপে তাকে হত্যা করেন। হাদিসের ভাষায়, এরপর তার দুই পায়ের মাঝে একটি শিশু পড়ে যায় এবং সেখানে সবকিছু রক্তে মাখামাখি হয়ে যায়। বর্ণনা থেকে স্পষ্ট যে নারীটি গর্ভবতী ছিলেন।
পরদিন মুহাম্মদ লোকজন জড়ো করে বলেন, যে এই কাজ করেছে সে যেন দাঁড়ায়। অন্ধ লোকটি কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে বলেন, তিনিই তার মালিক; সে নবীকে গালি দিত, নিষেধ মানত না; তার গর্ভজাত মুক্তোর মতো দুটি ছেলে আছে, আর সে তার প্রতি সদয় ছিল। মুহাম্মদ বলেন: “সাক্ষী থাকো, তার রক্ত মূল্যহীন (হাদার)।” অর্থাৎ হত্যাকারীর কোনো শাস্তি হবে না, কোনো রক্তমূল্যও দিতে হবে না।
সুনানে আবু দাউদের পরের হাদিসেই (৪৩৬২) আলি ইবনে আবু তালিবের সূত্রে একই ধরনের আরেকটি ঘটনা আছে: এক ইহুদি নারী মুহাম্মদকে গালি দিতেন, এক ব্যক্তি তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে, এবং মুহাম্মদ তার রক্তও মূল্যহীন ঘোষণা করেন।
উপসংহার
ঘটনাগুলোতে একটি সুস্পষ্ট ধারা দেখা যায়, কথা বা কবিতার মাধ্যমে সমালোচনা, তার জবাবে গোপন হত্যা, এবং মুহাম্মদের আগাম নির্দেশ বা পরবর্তী অনুমোদন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন বৃদ্ধ, নারী, মা ও দাসী; পদ্ধতি ছিল ছলনা, মিথ্যা ও ঘুমন্ত মানুষের ওপর আক্রমণ; আর কোনো ক্ষেত্রেই বিচার হয়নি।
যাকে সর্বকালের নৈতিক আদর্শ বলে দাবি করা হয়, তার আচরণ অনুসারীদের জন্যও আদর্শ হয়ে ওঠে, ধ্রুপদি আলেমরা ঠিক সেভাবেই এই ঘটনাগুলো পড়েছেন, আর আজকের ঘাতকরাও সেভাবেই পড়ে।
তাই প্রশ্নটি কেবল ইতিহাসের নয়। মুক্ত মত প্রকাশ, ন্যায্য বিচার এবং প্রতিটি মানুষের জীবনের সমান মূল্য, এই মৌলিক নীতিগুলোর সঙ্গে এমন কোনো নৈতিক কাঠামো সহাবস্থান করতে পারে না, যা সমালোচনার জবাবে তলোয়ারকে বৈধতা দেয়। ধর্ম অবমাননার নামে হত্যা বন্ধ করতে হলে প্রথমে এই নজিরগুলোর নৈতিক বৈধতাকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হবে।
এই প্রবন্ধে নবী মুহাম্মদের বৈবাহিক জীবন, নারীর প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ, আয়েশার সঙ্গে বাল্যবিবাহ, যুদ্ধবন্দি নারীদের গ্রহণ এবং দাসী-সম্পর্কিত বিধান ধর্মনিরপেক্ষ, যুক্তিনির্ভর ও মানবাধিকারভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। উপাত্ত নেওয়া হয়েছে মূলত কুরআন, সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসাঈ, ইবনে ইসহাক-ইবনে হিশামের সিরাত, ইবনে সাদের তাবাকাত এবং তাবারির তারিখ ও তাফসির থেকে; অর্থাৎ মুসলিম ঐতিহ্যেরই সর্বাধিক গৃহীত উৎস থেকে।
ইসলামি ধর্মতত্ত্ব মুহাম্মদকে সর্বকালের জন্য “উত্তম আদর্শ” (উসওয়াতুন হাসানাহ, কুরআন ৩৩:২১) এবং সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত (৩৪:২৮) বলে দাবি করে। এই সর্বজনীনতার দাবি থাকলে তাঁর আচরণকে কেবল সপ্তম শতাব্দীর আরব মানদণ্ডে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ থাকে না; বরং আধুনিক মানবাধিকার আইন, শিশু অধিকার সনদ এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের আলোকে তা মূল্যায়ন করা যৌক্তিকভাবেই প্রাসঙ্গিক। বিশ্লেষণে দেখা যায়, অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে (নাবালিকা বিবাহ, যুদ্ধবন্দি নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক এবং দাসপ্রথার বৈধতা) ঐতিহ্যগত বর্ণনাগুলো আজকের সর্বজনীন মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক।
ভূমিকা
ধর্মপ্রবর্তকদের ব্যক্তিগত জীবন সাধারণত ইতিহাসবিদদের আগ্রহের বিষয় হলেও ইসলামের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইসলামি আইনশাস্ত্রে (ফিকহ) নবীর কথা, কাজ ও মৌন সম্মতি, অর্থাৎ সুন্নাহ, কুরআনের পরেই আইনের দ্বিতীয় প্রধান উৎস। ফলে মুহাম্মদ কাকে, কখন, কোন বয়সে বিয়ে করেছেন, যুদ্ধে বন্দি নারীদের সঙ্গে কী আচরণ করেছেন, দাসীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেমন ছিল, এসব প্রশ্ন কেবল ঐতিহাসিক কৌতূহল নয়; এগুলো চৌদ্দ শতাব্দী ধরে কোটি মানুষের পারিবারিক আইন, বিবাহের বয়স ও নারীর আইনি মর্যাদা নির্ধারণ করেছে এবং আজও করছে।
অনেকে প্রশ্ন তুলবেন যে ইতিহাসচর্চায় একটি সাধারণ নীতি হলো, অতীতের মানুষকে তাঁদের সময়ের প্রেক্ষাপটে বোঝা উচিত। এই নীতি সাধারণ ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে যৌক্তিক। জুলিয়াস সিজার বা চেঙ্গিস খানকে কেউ চিরন্তন নৈতিক আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করে না। কিন্তু ইসলামি ধর্মতত্ত্ব মুহাম্মদ সম্পর্কে ভিন্ন ও অনেক বড় দাবি করে:
“নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসুলের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ” (কুরআন ৩৩:২১)। “আমি তোমাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে পাঠিয়েছি” (৩৪:২৮)। “আমি তোমাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছি” (২১:১০৭)। “নিশ্চয়ই তুমি মহান চরিত্রের অধিকারী” (৬৮:৪)। তিনি শেষ নবী (খাতামুন নাবিয়্যিন, ৩৩:৪০); অর্থাৎ তাঁর পরে আর কোনো সংশোধনী বা নতুন নৈতিক নির্দেশনা আসবে না।
এই দাবিগুলো একসঙ্গে পড়লে যুক্তিটি দাঁড়ায় এরকম: যদি মুহাম্মদের আচরণ সর্বকালের সব মানুষের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ হয়, তাহলে তা বর্তমান কালের মানুষের জন্যও আদর্শ। আর যদি এই যুগের মানুষের জন্য আদর্শ হয়, তাহলে একইভাবে এই যুগের নৈতিক ও আইনি মানদণ্ডে তা পরীক্ষা করা কেবল বৈধই নয়, অপরিহার্য। কোনো দাবি যত বড়, তার প্রমাণের দায়ও তত বড়। সর্বকালীন আদর্শের দাবি করে আবার কেবল সপ্তম শতাব্দীর মানদণ্ডে বিচারের দাবি করা যৌক্তিকভাবে অসংগত; একে দর্শনে “বিশেষ ছাড়ের আবেদন” (special pleading) বলা হয়।
মুহাম্মদের বৈবাহিক জীবনের রূপরেখা
ক্লাসিক্যাল উৎসে মুহাম্মদের স্ত্রীর সংখ্যা নিয়ে সামান্য মতভেদ থাকলেও সর্বাধিক গৃহীত তালিকায় এগারো থেকে তেরো জনের নাম পাওয়া যায়, যাঁদের সঙ্গে বিবাহ সম্পন্ন ও দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। মৃত্যুর সময় তাঁর নয়জন স্ত্রী জীবিত ছিলেন। নিচের সারণিতে ইবনে হিশাম, ইবনে সাদ ও তাবারির ভিত্তিতে মূল তথ্য দেওয়া হলো।
নাম
বিবাহের আনুমানিক সময়
প্রাসঙ্গিক তথ্য
খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ
আনু. ৫৯৫ খ্রি.
ধনী ব্যবসায়ী বিধবা; প্রায় ২৫ বছর একমাত্র স্ত্রী; ৬১৯ খ্রি.-এ মৃত্যু।
সাওদা বিনতে জামআ
৬১৯–৬২০
বিধবা; পরে তালাকের আশঙ্কায় নিজের পালার রাত আয়েশাকে দেন (বুখারি ৫২১২)।
আয়েশা বিনতে আবু বকর
আকদ ৬১৯–৬২০; সহবাস ৬২৩–৬২৪
সহিহ বর্ণনা অনুযায়ী আকদের সময় ৬, সহবাসের সময় ৯ বছর। একমাত্র কুমারী স্ত্রী।
আবু সুফিয়ানের কন্যা; আবিসিনিয়ায় থাকাকালীন প্রক্সি-বিবাহ।
সাফিয়া বিনতে হুয়াই
৬২৮
খায়বার যুদ্ধে বন্দি; পিতা, স্বামী ও আত্মীয়রা নিহত।
মায়মুনা বিনতে হারিস
৬২৯
বিধবা; শেষ বিবাহ।
মারিয়া আল-কিবতিয়া
৬২৮–৬২৯
মিশরের শাসক মুকাওকিসের উপহার দেওয়া দাসী; পুত্র ইবরাহিমের মা।
রায়হানা বিনতে যায়েদ
৬২৭
বনু কুরাইজা থেকে বন্দি; স্ত্রী নাকি দাসী, তা নিয়ে মতভেদ আছে।
একবিবাহ থেকে বহুবিবাহ
মুহাম্মদের জীবনে একটি স্পষ্ট বিভাজনরেখা রয়েছে। খাদিজার সঙ্গে প্রায় পঁচিশ বছরের দাম্পত্যে তিনি ছিলেন একবিবাহী। খাদিজার মৃত্যুর পর, বিশেষ করে মদিনায় হিজরতের (৬২২) পর রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিবাহের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ে। মদিনার দশ বছরে তিনি অন্তত দশটি বিবাহ করেন, যার মধ্যে দুজন (জুওয়াইরিয়া ও সাফিয়া) সরাসরি যুদ্ধবন্দি এবং অন্তত দুজন (মারিয়া ও রায়হানা) দাসী হিসেবে উল্লিখিত।
আপোলজেটিক ভাষায় প্রায়ই বলা হয় যে খাদিজার সঙ্গে দীর্ঘ একবিবাহ প্রমাণ করে তাঁর বিবাহগুলো কামনাপ্রসূত ছিল না। কিন্তু এই যুক্তির একটি সমস্যা হলো, খাদিজার সঙ্গে বিবাহকালীন সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। খাদিজা ছিলেন ধনী ও প্রভাবশালী, মুহাম্মদ ছিলেন তাঁর কর্মচারী এবং অর্থনৈতিকভাবে তাঁর ওপর নির্ভরশীল। ইবনে সাদ ও অন্য সিরাত লেখকদের বর্ণনায় দেখা যায় বিবাহের প্রস্তাবও খাদিজার দিক থেকে এসেছিল। অর্থাৎ ক্ষমতার সমীকরণ তখন ভিন্ন ছিল। ক্ষমতা অর্জনের পর আচরণের পরিবর্তনকে ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে উপেক্ষা করা যায় না।
কুরআনে নবীর জন্য বিশেষ ছাড়
কুরআন সাধারণ মুসলিম পুরুষের জন্য একসঙ্গে সর্বোচ্চ চারজন স্ত্রী নির্ধারণ করেছে (৪:৩)। কিন্তু নবীর ক্ষেত্রে এই সীমা প্রযোজ্য ছিল না। সূরা আহজাবের ৫০ নম্বর আয়াতে নবীর জন্য বৈধ নারীদের একটি দীর্ঘ তালিকা দেওয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে কোনো মুমিন নারী যদি নিজেকে নবীর কাছে সমর্পণ করে এবং নবী তাকে বিয়ে করতে চান, তবে তা বৈধ, এবং এই সুবিধা “বিশেষভাবে তোমার জন্য, অন্য মুমিনদের জন্য নয়”।
পরের আয়াতে (৩৩:৫১) নবীকে স্ত্রীদের মধ্যে পালা বণ্টনের বাধ্যবাধকতা থেকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়: “তুমি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা দূরে রাখতে পারো এবং যাকে ইচ্ছা কাছে রাখতে পারো।” অথচ সাধারণ মুসলিমদের জন্য স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায়বিচার বাধ্যতামূলক (৪:৩, ৪:১২৯)।
এই প্রসঙ্গে সহিহ বুখারিতে আয়েশার একটি মন্তব্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। যেসব নারী নিজেদের নবীর কাছে সমর্পণ করতেন তাঁদের প্রতি আয়েশা বিরক্তি প্রকাশ করতেন এবং বলতেন, একজন নারী কীভাবে নিজেকে সমর্পণ করতে পারে! এরপর যখন ৩৩:৫১ আয়াত নাজিল হলো, আয়েশা বললেন:
“আমি দেখছি, আপনার রব আপনার ইচ্ছা পূরণে দ্রুত সাড়া দেন।” (সহিহ বুখারি ৪৭৮৮, কিতাবুত তাফসির; সহিহ মুসলিম ১৪৬৪)
এটি কোনো সমালোচকের বানানো কথা নয়; এটি নবীর সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রীর মুখ থেকে সর্বোচ্চ বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থে সংরক্ষিত। একজন যুক্তিবাদী পাঠকের কাছে প্রশ্নটি স্বাভাবিক: যখন ঐশী বিধান বারবার আইনপ্রণেতার ব্যক্তিগত সুবিধার অনুকূলে আসে, এবং তা এমন ক্ষেত্রে যেখানে অন্যদের ওপর কঠোর সীমা আরোপিত, তখন তা স্বার্থের সংঘাত (conflict of interest) হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য কি না। আধুনিক আইনি ও প্রশাসনিক নীতিতে এমন একজন আইনপ্রণেতা, যিনি নিজের জন্য নিয়মের ব্যতিক্রম তৈরি করেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মৌলিক নীতি লঙ্ঘন করছেন বলে গণ্য হতেন।
মুহাম্মদের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রীদের পুনর্বিবাহ চিরতরে নিষিদ্ধ করা হয় (৩৩:৫৩)। অর্থাৎ বহু তরুণ বিধবা, যেমন নবীর মৃত্যুর সময় মাত্র আঠারো বছর বয়সী আয়েশা, আজীবন একাকী থাকতে বাধ্য হন। অথচ, অন্য ব্যক্তিদের বিধবা স্ত্রীদেরকে মুহাম্মদ বিয়ে করেছিল (উপরের স্ত্রীদের তালিকা দেখুন) শুধু তাই নয়, আক্রমণাত্মক যুদ্ধে বন্দি বিবাহিত নারীদের জোরপূর্বক ধর্ষণ করতে এই মুহম্মদ অনুমতি দিয়েছিল (এ সংক্রান্ত হাদিস নিচের অংশে দেয়া আছে)।
নারীর প্রতি অতিমাত্রায় আকর্ষণ
আনাস ইবনে মালিক বর্ণনা করেন, নবী দিন বা রাতের একটি নির্দিষ্ট সময়ে তাঁর সব স্ত্রীর কাছে পর্যায়ক্রমে যেতেন, এবং তাঁরা সংখ্যায় এগারোজন ছিলেন। জিজ্ঞাসা করা হলো, তিনি কি এতে সক্ষম ছিলেন? আনাস বললেন, আমরা বলাবলি করতাম যে তাঁকে ত্রিশজন পুরুষের শক্তি দেওয়া হয়েছে (সহিহ বুখারি ২৬৮)।
আপনি কল্পনা করুন, যে ব্যক্তি প্রতদিন ১১ জন স্ত্রীর কাছে পালাক্রমে শারীরিক সম্পর্ক করতে যেত তার অন্য কিছু করার সময় কিভাবে হতো? একজনের সাথে ৩০ মিনিট করে ধরলেও প্রতিদিন ৫ ঘণ্টার বেশি সময় দিত শারীরিক চাহিদা পূরণ করার জন্য, এমন একজন ব্যক্তিকে আপনি নবী হিসেবে মনে করলে, আপনার মানসিক বিকলাঙ্গতার সমূহ সম্ভাবনা দেখছি।
চলুন কিছু হাদিস দেখে নেই, “তোমাদের দুনিয়ার মধ্যে আমার কাছে প্রিয় করা হয়েছে নারী ও সুগন্ধি, আর আমার চোখের শীতলতা রাখা হয়েছে নামাজে” (সুনানে নাসাঈ ৩৯৩৯; সনদকে অনেক মুহাদ্দিস হাসান বা সহিহ বলেছেন)।
সূরা তাহরিমের (৬৬:১–৫) প্রেক্ষাপটে স্ত্রীদের মধ্যে ঈর্ষা, গোপন কথা ফাঁস এবং নবীর সব স্ত্রীকে তালাক দিয়ে “উত্তম” স্ত্রী দেওয়ার হুমকি (৬৬:৫) উল্লিখিত হয়েছে। এর প্রেক্ষাপট সম্পর্কে দুটি বর্ণনা আছে, যা লেখার নিচের অংশে আলোচিত হয়েছে।
মুসলিম ঐতিহ্যে এসব বর্ণনাকে নবীর পৌরুষ ও পূর্ণতার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। একজন ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্লেষকের কাছে প্রশ্নটি ভিন্ন: যে ব্যক্তি নিজের জন্য চার স্ত্রীর সীমা, পালা বণ্টনের দায় এবং অন্যান্য নিয়ম থেকে ছাড় পান, এবং যাঁর বিবাহের সংখ্যা ক্ষমতার সঙ্গে সমানুপাতিকভাবে বাড়ে, তাঁর যৌন ও বৈবাহিক আচরণকে “সর্বকালের উত্তম আদর্শ” বলা কতটা যৌক্তিক? বিশেষ করে যখন অন্য যেকোনো ক্ষমতাধর পুরুষের ক্ষেত্রে একই আচরণ আমরা ক্ষমতার অপব্যবহারের নিদর্শন হিসেবে জানি।
মুহাম্মদের সাথে আয়েশার বাল্যবিবাহ
আয়েশার বিবাহের বয়স সম্পর্কে সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে একাধিক বর্ণনা রয়েছে, যা পরস্পরকে সমর্থন করে:
আয়েশা বর্ণনা করেন: “নবী যখন আমাকে বিয়ে করেন তখন আমার বয়স ছিল ছয় বছর, এবং আমার নয় বছর বয়সে তিনি আমার সঙ্গে দাম্পত্য জীবন শুরু করেন।” (সহিহ বুখারি ৫১৩৩, ৫১৩৪, ৫১৫৮, ৩৮৯৪; সহিহ মুসলিম ১৪২২)
বুখারি ৩৮৯৪-এর দীর্ঘ বর্ণনায় আয়েশা বলেন, দাম্পত্য শুরুর দিন তিনি বান্ধবীদের সঙ্গে দোলনায় খেলছিলেন; তাঁর মা তাঁকে ডেকে নিয়ে গেলেন, হাঁপানো অবস্থায় দরজায় দাঁড় করালেন, মুখ ধুইয়ে দিলেন, তারপর আনসারি নারীরা তাঁকে সাজিয়ে দিলেন, এবং মধ্যাহ্নে নবী এলেন। সুনানে আবু দাউদে (৪৯৩৩) একই ঘটনার বর্ণনায় আছে যে তখন তাঁর চুল ছোট করে কাটা ছিল এবং তিনি দোলনা থেকে নেমে এসেছিলেন।
সহিহ মুসলিমের একটি বর্ণনায় (১৪২২) যোগ করা হয়েছে: “তাঁর খেলনা-পুতুল তাঁর সঙ্গে ছিল, এবং নবী যখন মারা যান তখন তাঁর বয়স আঠারো।” বুখারি ৬১৩০-এ আয়েশা বলেন, তিনি নবীর উপস্থিতিতে পুতুল নিয়ে খেলতেন এবং তাঁর বান্ধবীরাও খেলত। এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইবনে হাজার আসকালানি (ফাতহুল বারি) উল্লেখ করেছেন যে আলেমগণ এ থেকে মেয়েশিশুদের পুতুল খেলার বৈধতা নিয়েছেন, কারণ এটি তাদের ঘরকন্নার প্রশিক্ষণ, এবং আয়েশা তখন ছোট ছিলেন, প্রাপ্তবয়স্ক হননি। অর্থাৎ ক্লাসিক্যাল ভাষ্যকারও বয়সের এই বর্ণনাকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করেছেন।
ইসলামে বাল্যবিবাহের আইনি বৈধতা
আয়েশার বিবাহ কোনো বিচ্ছিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে থেকে যায়নি; এটি ইসলামি আইনে নাবালিকা বিবাহের বৈধতার প্রধান দলিল হয়ে উঠেছে। সহিহ বুখারিতে ইমাম বুখারি একটি অধ্যায়ের শিরোনাম দিয়েছেন: “কেউ নিজের নাবালক সন্তানদের বিয়ে দিলে” (বাবু ইনকাহির রাজুলি ওয়ালাদাহুস সিগার), এবং সেখানে দলিল হিসেবে কুরআন ৬৫:৪ উদ্ধৃত করেছেন।
কুরআনের ৬৫:৪ আয়াতে তালাকপ্রাপ্ত নারীর ইদ্দত (অপেক্ষাকাল) সম্পর্কে বলা হয়েছে: যারা ঋতুস্রাবের বয়স পেরিয়ে গেছে তাদের ইদ্দত তিন মাস, “এবং যাদের এখনো ঋতুস্রাব হয়নি (ওয়াল্লাঈ লাম ইয়াহিদনা), তাদেরও”। তাবারি, ইবনে কাসির, কুরতুবিসহ প্রধান ক্লাসিক্যাল মুফাসসিরগণ “যাদের এখনো ঋতুস্রাব হয়নি” অংশটিকে অল্পবয়সী, প্রাক-বয়ঃসন্ধি মেয়েদের অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন। ইদ্দত কেবল তখনই প্রাসঙ্গিক যখন বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে এবং (সাধারণ নিয়মে) দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে, কারণ দাম্পত্যের আগে তালাক হলে ইদ্দত নেই (৩৩:৪৯)। ফলে ক্লাসিক্যাল ব্যাখ্যা অনুযায়ী এই আয়াত প্রাক-বয়ঃসন্ধি মেয়ের সঙ্গে বিবাহ ও দাম্পত্যকে স্বীকৃতি দেয়।
চার সুন্নি মাযহাবই পিতা (এবং শাফেয়ি মতে দাদা) কর্তৃক নাবালিকা কন্যাকে তার সম্মতি ছাড়া বিয়ে দেওয়ার অধিকার (ইজবার) স্বীকার করে। দাম্পত্যের সময় নির্ধারণে অধিকাংশ ফকিহ নির্দিষ্ট বয়সের পরিবর্তে মেয়েটির শারীরিকভাবে “সহ্য করার সক্ষমতা” (ইতাকাতুল ওয়াত) মানদণ্ড ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ ক্লাসিক্যাল ফিকহে বিবাহের কোনো ন্যূনতম বয়স নেই, আর দাম্পত্যের মানদণ্ড শারীরিক, মানসিক বা সম্মতিভিত্তিক নয়।
একটি মজার ব্যপার দেখুন, যেই মুহাম্মদ ছয় বছরের একটি শিশুকে বিয়ে করেছে, ঠিক তার বিপরীতভাবে নিজের মেয়ে ফাতিমাকে ১৪/১৫ বছর বয়সে আবু বকর এবং উমর বিয়ের প্রস্তাব দিলে মুহাম্মদ তাদের এই বলে মানা করে দেয় যে, তার মেয়ে ছোট। সুনানে আন-নাসায়ী : ৩২২১, আবু বকর ও উমর (রাঃ) ফাতিমা (রাঃ)-এর বিবাহের প্রস্তাব পেশ করলে মুহাম্মদ বললেন: সে তো অল্পবয়স্কা।
আধুনিক আইন ও বিজ্ঞানের আলোকে এই বাল্যবিবাহ
আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনে বাল্যবিবাহ একটি মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে স্বীকৃত: UDHR অনুচ্ছেদ ১৬(২): বিবাহ কেবল ইচ্ছুক দম্পতির স্বাধীন ও পূর্ণ সম্মতিতেই সম্পন্ন হবে। ছয় বছরের শিশুর “স্বাধীন ও পূর্ণ সম্মতি” ধারণাগতভাবেই অসম্ভব। শিশু অধিকার সনদ (CRC): আঠারো বছরের কম প্রত্যেক ব্যক্তি শিশু (অনুচ্ছেদ ১); রাষ্ট্র শিশুকে সব ধরনের যৌন শোষণ ও নির্যাতন থেকে রক্ষা করবে (অনুচ্ছেদ ৩৪)।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের দিক থেকেও বিষয়টি পরিষ্কার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী কিশোরী মাতৃত্ব মাতৃমৃত্যু, অবস্ট্রেটিক ফিস্টুলা, অপরিণত জন্ম এবং শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়; বয়স যত কম, ঝুঁকি তত বেশি। মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণাও দেখায় যে বাল্যবিবাহ শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া, পারিবারিক সহিংসতা, বিষণ্নতা ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাতের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে সম্পর্কিত। “বয়ঃসন্ধি হলেই বিবাহযোগ্য” এই ধারণা জীববিজ্ঞানের দিক থেকেও ভুল: ঋতুস্রাব শুরু হওয়া মানে শরীর বা মস্তিষ্ক পূর্ণ পরিপক্বতায় পৌঁছানো নয়। মস্তিষ্কের যে অংশ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিণাম বিবেচনার জন্য দায়ী (প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স), তার বিকাশ বিশের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলে।
বাস্তব পরিণতি এবং বর্তমান অবস্থা
আয়েশার বিবাহ যদি কেবল একটি অতীত ঘটনা হতো, তবে তা ইতিহাসবিদদের বিতর্কের বিষয় হয়ে থাকত। কিন্তু সুন্নাহর আইনি মর্যাদার কারণে এটি আজও রাজনৈতিক ও আইনি প্রভাব রাখে। ইয়েমেনে বিবাহের ন্যূনতম বয়স নির্ধারণের আইনি প্রচেষ্টা একাধিকবার ধর্মীয় বিরোধিতায় আটকে গেছে, এবং বিরোধীরা সরাসরি আয়েশার দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছেন। ইরানের দেওয়ানি আইনে মেয়েদের বিবাহের সাধারণ বয়স ১৩, এবং আদালতের অনুমতিসাপেক্ষে এর চেয়েও কম বয়সে বিবাহ সম্ভব। বাংলাদেশে ইউনিসেফের হিসাবে বাল্যবিবাহের হার দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চগুলোর একটি, এবং ধর্মীয় বক্তাদের একটি অংশ প্রকাশ্যে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনকে “শরিয়াহবিরোধী” বলে প্রচার করেন।
এখানেই সর্বজনীনতার দাবির প্রকৃত পরিণতি দৃশ্যমান হয়। একটি ঐতিহাসিক আচরণকে যখন চিরন্তন আদর্শের মর্যাদা দেওয়া হয়, তখন তা আর ইতিহাস থাকে না; তা বর্তমানের শিশুদের জীবন নির্ধারণ করে।
জয়নাব বিনতে জাহশ: পালকপুত্রের স্ত্রী
জায়েদ ও মুহাম্মদের সম্পর্ক
এ বিষয়ে জানার আগে জায়েদ ও মুহাম্মদের সম্পর্ক নিয়ে জানতে হবে। ইবনে সাদের তাবাকাতুল কুবরায় (৩য় খণ্ড, যায়েদ ইবনে হারিসার জীবনী)। পরে ইবনে আবদিল বার (আল-ইসতিআব) ও ইবনে হাজার (আল-ইসাবা) এটি উদ্ধৃত করেছেন।
শৈশবে যায়েদ অপহৃত হয়ে দাস হিসেবে বিক্রি হন। হাকিম ইবনে হিযাম তাঁকে কিনে ফুফু খাদিজাকে দেন, আর খাদিজা তাঁকে মুহাম্মদকে উপহার দেন। যায়েদের পিতা হারিসা ও চাচা কাব খোঁজ পেয়ে মুক্তিপণ নিয়ে মক্কায় আসেন। মুহাম্মদ যায়েদকে বেছে নেওয়ার সুযোগ দেন। যায়েদ নিজের পরিবারের বদলে মুহাম্মদের কাছে থাকা বেছে নেন। এরপর মুহাম্মদ তাঁকে কাবার হিজরে (হাতিম) নিয়ে গিয়ে ঘোষণা করেন: “يا من حضر، اشهدوا أن زيدا ابني، يرثني وأرثه”, অর্থাৎ উপস্থিত সবাই সাক্ষী থাকো, যায়েদ আমার পুত্র, সে আমার উত্তরাধিকারী হবে এবং আমি তার। পিতা ও চাচা সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে যান। তখন থেকে তাঁকে “যায়েদ ইবনে মুহাম্মদ” ডাকা হতো।
বুখারী ৪৭৮২, মুসলিম ২৪২৫ (ইবনে উমরের সূত্রে): আমরা যায়েদ ইবনে হারিসাকে “যায়েদ ইবনে মুহাম্মদ” ছাড়া অন্য নামে ডাকতাম না, যতক্ষণ না আয়াত নাজিল হয়: “ادعوهم لآبائهم” (তাদের পিতার নামে ডাকো, সূরা আহযাব ৩৩:৫)।
বুখারী ৪০০০ (আয়েশার সূত্রে): আবু হুজাইফা সালিমকে পালক পুত্র করেছিলেন, যেভাবে নবী যায়েদকে করেছিলেন। জাহেলি যুগে কেউ কাউকে পালক পুত্র করলে লোকে তাকে পালক পিতার নামে ডাকত এবং সে উত্তরাধিকারও পেত, যতক্ষণ না উপরোক্ত আয়াত নাজিল হয়।
তিরমিযী ৩৮১৫ (যায়েদের ভাই জাবালা ইবনে হারিসার সূত্রে): জাবালা নবীর কাছে এসে যায়েদকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চান। নবী বলেন, সে এখানে আছে, যেতে চাইলে বাধা দেব না। যায়েদ বলেন, আমি আপনার ওপর কাউকে বেছে নেব না।
এ ঘটনা থেকে এ বিষয় স্পষ্ট যে, জায়েদ মুহাম্মদকে নিজের বাবার চেয়ে বেশি ভালোবাসতো, তাই বাবার পরিবর্তে মুহাম্মদের কাছে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়, এবং মুহাম্মদ সেই প্রতিদান হিসেবে জায়েদকে নিজের পুত্র এবং উত্তরাধিকার ঘোষণা করে।
মুহাম্মদ ও জয়নাবের প্রণয়
জয়নাব বিনতে জাহশ ছিলেন মুহাম্মদের ফুফাতো বোন। মুহাম্মদ নিজেই তাঁকে তাঁর পালকপুত্র যায়েদের সঙ্গে বিয়ে দেন, যদিও জয়নাব ও তাঁর পরিবার প্রথমে রাজি ছিলেন না। তখন কুরআন ৩৩:৩৬ নাজিল হয়: আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয়ে ফয়সালা দিলে কোনো মুমিন নারী বা পুরুষের নিজস্ব সিদ্ধান্তের অধিকার থাকে না।
ইবনে সাদ, তাবাকাত (৮ম খণ্ড, যায়নাবের জীবনী), সূত্র: ওয়াকিদি → আবদুল্লাহ ইবনে আমির আল-আসলামি → মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে হিব্বান থেকে বর্ণিত, নবী জায়েদের খোঁজে তাঁর বাড়িতে যান, জায়েদ ঘরে ছিলেন না। জয়নাব তাড়াতাড়ি উঠে আসেন স্বল্প বস্র পরিহিত অবস্থায়। নবী মুখ ফিরিয়ে নেন এবং অস্পষ্টভাবে কিছু বলতে বলতে চলে যান। শুধু বোঝা যায়: “سبحان الله العظيم، سبحان مصرف القلوب” (মহান আল্লাহ পবিত্র, অন্তর যিনি ঘোরান তিনি পবিত্র)। জায়েদ ফিরে এসে ঘটনা শোনেন, নবীর কাছে গিয়ে বলেন, আপনার পছন্দ হলে আমি জয়নাবকে তালাক দেব। নবী বলেন “أمسك عليك زوجك” (তোমার স্ত্রীকে রেখে দাও)। এরপর যায়েদ আর স্বাভাবিকভাবে স্ত্রীর কাছে যেতে পারেননি, এবং শেষে তালাক দেন।
ঠিক তখনই নাজিল হয় (সূরা আহযাব ৩৩:৩৭) “আর স্মরণ করুন, আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন এবং আপনিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, আপনি তাকে বলছিলেন, ‘তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছেই রাখো এবং আল্লাহকে ভয় করো।’ আর আপনি আপনার অন্তরে যা লুকিয়ে রাখছিলেন (জয়নাবকে বিয়ে করার ইচ্ছা), যা আল্লাহ প্রকাশ করতে চান এবং আপনি মানুষকে ভয় করছিলেন, অথচ আল্লাহই বেশি হকদার যে, আপনি তাঁকে ভয় করবেন। অতঃপর যখন জায়েদ তার স্ত্রীকে তালাক দিল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলাম, যাতে মুমিনদের পালিত পুত্ররা তাদের স্ত্রীদের তালাক দিলে সেই স্ত্রীদের বিয়ে করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা না থাকে। আর আল্লাহর নির্দেশ কার্যকর হয়েই থাকে।
এটাকে কি নাজিল বলা যায়, নাকি জয়নাবকে বিয়ে করার জন্য আয়াত রচনা করা হয়েছে? তাবারীর তাফসীর (সূরা আহযাব ৩৩:৩৭), আবদুর রহমান ইবনে জায়েদ ইবনে আসলামের নিজের বক্তব্য: নবী যায়েদের খোঁজে যান। দরজায় পশমের একটি পর্দা ছিল। বাতাসে পর্দা সরে যায়, আর যায়নাব ঘরের ভেতরে অনাবৃত (حاسرة) অবস্থায় ছিলেন। নবীর অন্তরে তাঁর প্রতি মুগ্ধতা জন্মায়, আর সেই থেকে জায়েদের কাছে তিনি অপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
একটা প্রশ্ন, আল্লাহ যদি সবকিছু জানে, তাহলে একবার আয়াত নামিয়ে জায়েদের সাথে বিয়ে, আবার আয়াত নামিয়ে মুহাম্মদের সাথে বিয়ে দেয়ার যৌক্তিকতা কি? ধরে নিলাম মুহাম্মদ জায়েদ-জয়নাবের বিয়ে ভাঙ্গে নাই, তাহলে আল্লাহ ও রাসূলের ফয়সালা ভুল কিভাবে হলো, যখন জায়েদ-জয়নাবের বিয়ের জন্য কুরআন ৩৩:৩৬ নাজিল হলো? ঠিক পরের আয়াতে, মুহাম্মদ আর জয়নাবের বিয়ের বাদ্য বেজে উঠল, বাহ কি চমৎকার।
মুহাম্মদ-জয়নাবের বিয়ে: একটি মানবিক নিয়মের মৃত্যু
আরব সমাজে পালকপুত্রকে ঔরসজাত পুত্রের সমান মনে করা হতো, ফলে পালকপুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে করা ছিল নিষিদ্ধ ও লজ্জাজনক। লেখার উপরের অংশে, মুহাম্মদ ও জায়েদের বাবা-ছেলের সুসম্পর্কের স্পষ্ট প্রমাণ পাও যায়। শুধুমাত্র নারী আসক্তির কারণে মুহাম্মদ দত্তক প্রথার মতো একটি মানবিক কাজকে নিষিদ্ধ করে গেছে।
কুরআন ৩৩:৩৭ এই বিবাহকে সরাসরি আল্লাহর নির্দেশ হিসেবে উপস্থাপন করে: “আমি তাকে তোমার সঙ্গে বিয়ে দিলাম, যাতে মুমিনদের জন্য তাদের পালকপুত্রদের স্ত্রীদের বিষয়ে কোনো অসুবিধা না থাকে।” একই সঙ্গে আয়াতটি বলে: “তুমি তোমার মনে এমন কিছু গোপন রাখছিলে যা আল্লাহ প্রকাশ করে দেবেন, এবং তুমি মানুষকে ভয় করছিলে, অথচ আল্লাহই অধিক যোগ্য যে তুমি তাঁকে ভয় করো।” এর পরপরই পালকপুত্র প্রথা বাতিল করা হয় এবং ঘোষণা করা হয় যে মুহাম্মদ কোনো পুরুষের পিতা নন (৩৩:৪, ৩৩:৪০)। যায়েদ, যিনি এতদিন “জায়েদ ইবনে মুহাম্মদ” নামে পরিচিত ছিলেন, তিনি আবার “জায়েদ ইবনে হারিসা” হয়ে যান।
সহিহ বুখারিতে (৭৪২০) আনাস বর্ণনা করেন, এই আয়াত জায়েদ ও জয়নাব প্রসঙ্গে নাজিল হয়েছে। এবং সহিহ মুসলিম (১৭৭) ও অন্যান্য বর্ণনায় আয়েশার উক্তি পাওয়া যায় যে, নবী যদি ওহির কোনো অংশ গোপন করতেন, তবে এই আয়াতটিই গোপন করতেন। অর্থাৎ নবীর নিকটতম মানুষদের কাছেও ঘটনাটি অস্বস্তিকর মনে হয়েছিল।
আধুনিক শিশু কল্যাণ আইনে দত্তক একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা ব্যবস্থা, এবং CRC-এর অনুচ্ছেদ ২০–২১ পরিবারহীন শিশুর বিকল্প পরিচর্যার কথা বলে। একজন ব্যক্তির বিবাহের প্রয়োজনে একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানের চিরস্থায়ী বিলোপ, ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিতে, ব্যক্তিগত স্বার্থ ও সর্বজনীন আইনপ্রণয়নের মধ্যে সীমারেখা মুছে যাওয়ার আরেকটি উদাহরণ।
যুদ্ধবন্দি নারী
কুরআন ৪:২৩–২৪ আয়াতে যেসব নারীকে বিবাহ করা নিষিদ্ধ তাদের তালিকা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে বিবাহিত নারীরাও রয়েছে: “এবং নারীদের মধ্যে যারা বিবাহিত, তারাও (নিষিদ্ধ), তবে তোমাদের ডান হাত যাদের মালিক হয়েছে (মা মালাকাত আয়মানুকুম) তারা ব্যতীত।”
এই আয়াতের নাজিলের প্রেক্ষাপট সহিহ মুসলিমে (১৪৫৬) আবু সাঈদ খুদরি বর্ণনা করেছেন: হুনাইন যুদ্ধের সময় আওতাসে মুসলিম বাহিনী শত্রুপক্ষকে পরাজিত করে বন্দিনী গ্রহণ করে। কিছু সাহাবি এই বন্দিনীদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে দ্বিধা বোধ করছিলেন, কারণ তাদের মুশরিক স্বামীরা তখনো জীবিত ছিল। তখন আল্লাহ এই আয়াত নাজিল করেন, অর্থাৎ ইদ্দত শেষ হলে তারা তোমাদের জন্য বৈধ।
সুনানে আবু দাউদে (২১৫৭) নবীর নির্দেশ উদ্ধৃত আছে: গর্ভবতী বন্দিনীর সঙ্গে সন্তান প্রসবের আগে এবং অন্যদের সঙ্গে একটি ঋতুস্রাব অতিক্রান্ত হওয়ার আগে সহবাস করা যাবে না (ইস্তিবরা)। এই নির্দেশের উদ্দেশ্য গর্ভের পিতৃত্ব নির্ধারণ; বন্দিনীর সম্মতি এই শর্তের অংশ নয়।
এখানে লক্ষণীয় যে, সাহাবিদের মধ্যেই একটি স্বাভাবিক নৈতিক দ্বিধা কাজ করছিল: জীবিত স্বামী আছে এমন নারীর সঙ্গে সম্পর্ক কি অন্যায় নয়? এবং সেই দ্বিধা দূর করা হয় ঐশী অনুমোদনের মাধ্যমে। একজন ধর্মনিরপেক্ষ পাঠকের কাছে এটি নৈতিক উন্নয়নের বিপরীত দিকের দৃষ্টান্ত: মানুষের বিবেক যেখানে থামতে চাইছিল, ধর্মীয় বিধান সেখানে এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিল।
বনু মুস্তালিক ও আজল
সহিহ বুখারিতে (৪১৩৮; আরও দেখুন ২৫৪২) আবু সাঈদ খুদরি বলেন: আমরা নবীর সঙ্গে বনু মুস্তালিকের যুদ্ধে গিয়েছিলাম এবং আরব বন্দিনী পেয়েছিলাম। আমাদের নারীসঙ্গের আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়েছিল, এবং আমরা আজল (বীর্যপাতের আগে প্রত্যাহার) করতে চাইছিলাম। আমরা নবীকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, তোমরা এটি না করলে কোনো ক্ষতি নেই, কারণ কিয়ামত পর্যন্ত যে প্রাণ অস্তিত্বে আসার তা আসবেই।
এই বর্ণনার অন্য সংস্করণে স্পষ্ট করা হয়েছে যে আজলের কারণ ছিল মুক্তিপণ: বন্দিনী গর্ভবতী হলে তাকে বিক্রি বা মুক্তিপণের বিনিময়ে ফেরত দেওয়া কঠিন হতো। নবীর উত্তরে আজলের প্রশ্নটির আলোচনা আছে, কিন্তু বন্দিনীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের প্রশ্নটি কোনো আপত্তির বিষয় হিসেবে উঠে আসেনি। আলোচনাটি ধর্মতাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক; নারীদের সম্মতি, মানসিক অবস্থা বা মানবিক মর্যাদা এখানে অনুপস্থিত। মনে রাখা প্রয়োজন, এই নারীরা কয়েক ঘণ্টা বা দিন আগে নিজেদের স্বামী, পিতা ও ভাইদের নিহত হতে দেখেছেন (বুখারি ২৫৪১ অনুযায়ী আক্রমণটি হয়েছিল অপ্রস্তুত অবস্থায়, যখন তাঁরা পশুদের পানি পান করাচ্ছিলেন)।
জুওয়াইরিয়া বিনতে হারিস
এই একই অভিযানে বনু মুস্তালিক গোত্রপ্রধান হারিসের কন্যা জুওয়াইরিয়া বন্দি হন (বুখারি ২৫৪১)। সুনানে আবু দাউদ (৩৯৩১) ও ইবনে হিশামের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি সাবিত ইবনে কায়সের ভাগে পড়েন, মুক্তির জন্য চুক্তি (মুকাতাবা) করেন এবং সাহায্য চাইতে নবীর কাছে আসেন। নবী প্রস্তাব দেন যে তিনি তাঁর মুক্তিপণ পরিশোধ করে তাঁকে বিয়ে করবেন; জুওয়াইরিয়া রাজি হন। এরপর সাহাবিরা নবীর আত্মীয়তার সম্মানে বনু মুস্তালিকের বহু বন্দিকে মুক্ত করে দেন।
আপোলজেটিক সাহিত্যে এই ঘটনাকে নবীর দূরদর্শিতা ও দয়ার উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, এবং এর ফলে অনেক বন্দির মুক্তি সত্যিই ঘটেছিল। তবে আধুনিক আইনি দৃষ্টিতে প্রশ্ন থেকে যায়: যে নারীর গোত্রকে সদ্য পরাজিত করা হয়েছে, যিনি নিজে দাসত্বে আছেন, এবং যাঁর সামনে বিকল্প হলো অন্য একজনের দাসী থাকা, তাঁর “সম্মতি” কি স্বাধীন সম্মতি? আন্তর্জাতিক আইনে “স্বাধীন ও পূর্ণ সম্মতি”র পূর্বশর্ত হলো জোর, হুমকি বা বলপ্রয়োগমূলক পরিস্থিতির অনুপস্থিতি।
সাফিয়া বিনতে হুয়াই
সাফিয়ার ঘটনাটি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি আলোচিত। সহিহ বুখারির একাধিক বর্ণনা (৩৭১, ৪২০০, ৪২১১, ৫০৮৫) এবং সহিহ মুসলিম (১৩৬৫) থেকে নিম্নলিখিত তথ্য প্রতিষ্ঠিত: খায়বার অভিযানে মুসলিম বাহিনী ইহুদি বসতি জয় করে, যোদ্ধাদের হত্যা করে এবং নারী ও শিশুদের বন্দি করে। দিহইয়া আল-কালবি নবীর কাছে একজন দাসী চাইলে নবী তাঁকে একজন বেছে নিতে বলেন; তিনি সাফিয়াকে নেন। একজন সাহাবি নবীকে বলেন যে সাফিয়া বনু কুরাইজা ও বনু নাদিরের নেত্রী, তিনি কেবল আপনারই উপযুক্ত। নবী দিহইয়াকে সাফিয়াসহ ডেকে পাঠান, সাফিয়াকে নিজের জন্য নেন এবং দিহইয়াকে অন্য একজন বন্দিনী নিতে বলেন। নবী সাফিয়াকে মুক্ত করেন এবং মুক্তিকেই তাঁর মোহরানা নির্ধারণ করেন। খায়বার থেকে মদিনায় ফেরার পথে, সাদ্দুস সাহবা নামক স্থানে, তাঁর ঋতুস্রাব শেষ হলে দাম্পত্য সম্পন্ন হয়; এক বর্ণনায় আছে যে পথে তিন রাত যাত্রাবিরতি দেওয়া হয়।
ইবনে হিশামের সিরাত অনুযায়ী সাফিয়ার স্বামী কিনানা ইবনে রাবিকে লুকানো সম্পদের সন্ধান আদায়ের জন্য নির্যাতন করা হয় এবং পরে হত্যা করা হয়; সাফিয়ার পিতা হুয়াই ইবনে আখতাব আগেই বনু কুরাইজার সঙ্গে নিহত হয়েছিলেন।
সময়রেখাটি বিবেচনা করুন: একজন তরুণী, যাঁর বয়স উৎস অনুযায়ী সতেরো বছরের কাছাকাছি, একই সপ্তাহে তাঁর সম্প্রদায় পরাজিত হয়েছে, স্বামী নিহত হয়েছেন, তিনি নিজে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে প্রথমে একজন সৈনিককে এবং পরে সেনাপতিকে বরাদ্দ হয়েছেন, এবং ফেরার পথেই তাঁর সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। মুসলিম ঐতিহ্যে বলা হয় যে সাফিয়া স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ ও বিবাহে সম্মত হয়েছিলেন, এবং পরবর্তী জীবনে তিনি নবীর প্রতি অনুগত ছিলেন। হতে পারে। কিন্তু আধুনিক আইনের প্রশ্নটি সহজ: এই পরিস্থিতিতে কোনো সম্মতিকে কি আইনত গ্রহণযোগ্য বলা যায়?
রায়হানা ও বনু কুরাইজা
ইবনে ইসহাক ও ইবনে সাদের বর্ণনা অনুযায়ী খন্দক যুদ্ধের পর বনু কুরাইজা আত্মসমর্পণ করলে তাদের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের (উৎসভেদে ৪০০ থেকে ৯০০ জন) হত্যা করা হয় এবং নারী ও শিশুদের দাস হিসেবে বণ্টন করা হয়। পুরুষদের হত্যার মূল তথ্য সহিহ বুখারিতেও (৪১২১, ৩০৪৩) রয়েছে। বন্দিনীদের মধ্য থেকে রায়হানা বিনতে যায়েদকে নবী নিজের জন্য বেছে নেন। কোনো বর্ণনায় তিনি মুক্ত হয়ে স্ত্রী হন, কোনো বর্ণনায় তিনি দাসী হিসেবেই থাকেন এবং স্বেচ্ছায় সেটিই বেছে নেন।
আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে
আধুনিক আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইন এই বিষয়ে দ্ব্যর্থহীন:
চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন (১৯৪৯), অনুচ্ছেদ ২৭: নারীদের তাদের সম্মানের ওপর যেকোনো আক্রমণ, বিশেষত ধর্ষণ, জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তি বা যেকোনো ধরনের অশালীন আক্রমণ থেকে বিশেষভাবে রক্ষা করতে হবে।
রোম সংবিধি (১৯৯৮), অনুচ্ছেদ ৭(১)(ছ) ও ৮(২)(খ)(xxii): ধর্ষণ, যৌন দাসত্ব, জোরপূর্বক গর্ভধারণ এবং সমমাত্রার অন্যান্য যৌন সহিংসতা যথাক্রমে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ। অনুচ্ছেদ ৭(১)(গ) দাসত্বকে (enslavement) মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে।
Prosecutor v. Kunarac et al. (ICTY, ২০০১–২০০২): সাবেক যুগোস্লাভিয়ার জন্য আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল বসনিয়ার ফোচায় বন্দি নারীদের আটকে রেখে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকে ধর্ষণ ও দাসত্ব হিসেবে সাজা দেয়। রায়ে প্রতিষ্ঠিত হয় যে বন্দিত্বের মতো স্বভাবগতভাবে বলপ্রয়োগমূলক পরিস্থিতিতে প্রকৃত সম্মতি সম্ভব নয়, এবং নারীদের ওপর মালিকানাসুলভ ক্ষমতা প্রয়োগই দাসত্বের মূল উপাদান।
এই মানদণ্ডে বিচার করলে, যুদ্ধে পরাজিত সম্প্রদায়ের নারীদের সৈন্যদের মধ্যে বণ্টন এবং তাদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন, তা বিবাহের আকারে হোক বা দাসীত্বের আকারে, আজ আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারযোগ্য অপরাধ। বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা এই মূল্যায়ন বদলায় না: ICC ডমিনিক অনগোয়েন মামলায় (২০২১) “জোরপূর্বক বিবাহ”কে আলাদাভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে সাজা দিয়েছে।
দাসী ও “মা মালাকাত আয়মানুকুম”
কুরআনে “মা মালাকাত আয়মানুকুম” (তোমাদের ডান হাত যাদের মালিক) শব্দবন্ধ প্রায় পনেরোবার এসেছে। যৌন সম্পর্কের বৈধতা প্রসঙ্গে সবচেয়ে স্পষ্ট আয়াত দুটি প্রায় অভিন্ন ভাষায় দুই সূরায় রয়েছে:
“এবং যারা নিজেদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে, তবে নিজেদের স্ত্রী অথবা তাদের ডান হাত যাদের মালিক, তাদের ক্ষেত্রে ব্যতীত; এতে তারা নিন্দনীয় নয়।” (কুরআন ২৩:৫–৬; ৭০:২৯–৩০)
এখানে দাসীকে স্ত্রীর পাশাপাশি একটি আলাদা বৈধ যৌনসঙ্গী শ্রেণি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআন ৪:৩ স্ত্রীর সংখ্যা চারে সীমিত করলেও দাসীর সংখ্যায় কোনো সীমা আরোপ করেনি, এবং ক্লাসিক্যাল ফিকহে সর্বসম্মতভাবে এটিই গৃহীত হয়েছে। ক্লাসিক্যাল ফিকহ অনুযায়ী মালিক ও দাসীর সম্পর্কের জন্য বিবাহ, মোহরানা বা দাসীর সম্মতির প্রয়োজন নেই; মালিকানাই (মিলকুল ইয়ামিন) বৈধতার ভিত্তি। নবীর ক্ষেত্রে কুরআন ৩৩:৫০ স্পষ্টভাবে যুদ্ধলব্ধ দাসীদের (“যাদের আল্লাহ তোমাকে ফাই হিসেবে দিয়েছেন”) বৈধ বলেছে, এবং ৩৩:৫২ যেখানে নতুন স্ত্রী গ্রহণ নিষিদ্ধ করেছে, সেখানেও “তোমার ডান হাত যাদের মালিক” তাদের ব্যতিক্রম রেখেছে।
মারিয়া আল-কিবতিয়া
মিশরের বাইজেন্টাইন শাসক মুকাওকিস নবীর চিঠির জবাবে উপহার হিসেবে দুজন দাসী পাঠান: মারিয়া ও তাঁর বোন সিরিন। নবী মারিয়াকে নিজের জন্য রাখেন এবং সিরিনকে কবি হাসসান ইবনে সাবিতকে দেন। মারিয়ার গর্ভে নবীর পুত্র ইবরাহিম জন্মগ্রহণ করে এবং শৈশবেই মারা যায়। অধিকাংশ উৎস অনুযায়ী মারিয়ার সঙ্গে নবীর কোনো আনুষ্ঠানিক বিবাহ হয়নি; তিনি উম্মে ওয়ালাদ (মালিকের সন্তানের মা) হিসেবে বিবেচিত ছিলেন।
সূরা তাহরিমের প্রথম আয়াত (“হে নবী, আল্লাহ যা তোমার জন্য বৈধ করেছেন, তুমি তা নিজের জন্য নিষিদ্ধ করছ কেন, তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টির জন্য?”) সুনানে নাসাঈর (৩৯৫৯) বর্ণনায়, এবং তাবারির তাফসিরে বেশ কিছু বর্ণনায় বলা হয়েছে যে নবীর একজন দাসী ছিল যার সঙ্গে তিনি শারীরিক সম্পর্ক রাখতেন, এবং আয়েশা ও হাফসার চাপে তিনি তাকে নিজের জন্য নিষিদ্ধ করেন। তাবারির বর্ণনায় এটি হাফসার ঘরে মারিয়ার সঙ্গে ঘটেছিল বলে উল্লেখ আছে।
উপহার হিসেবে প্রাপ্ত একজন মানুষ, যাঁর নিজের মতামত কোনো উৎসে সংরক্ষিত হয়নি, একজন শাসকের যৌনসঙ্গী হয়েছিলেন। আধুনিক আইনে কোনো মানুষকে উপহার হিসেবে দেওয়া বা গ্রহণ করাই মানবপাচার (UN Palermo Protocol, ২০০০) এবং দাসত্ব (দাসপ্রথা সনদ, ১৯২৬, অনুচ্ছেদ ১: কোনো ব্যক্তির ওপর মালিকানার অধিকারসংশ্লিষ্ট যেকোনো ক্ষমতার প্রয়োগ)।
ইসলামে দাসপ্রথা: নিয়ন্ত্রণ, নাকি বিলোপ?
মুসলিম পণ্ডিতদের একটি শক্তিশালী যুক্তি হলো, ইসলাম দাসপ্রথার উদ্ভাবক নয়; বরং এটি একটি সর্বজনীন প্রাচীন প্রথাকে সংস্কার করেছে এবং ধাপে ধাপে বিলোপের পথ খুলে দিয়েছে। এর পক্ষে প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়: দাসমুক্তিকে বিভিন্ন পাপের কাফফারা নির্ধারণ (৪:৯২, ৫:৮৯, ৫৮:৩), জাকাতের একটি খাত দাসমুক্তির জন্য নির্ধারণ (৯:৬০), মুক্তিচুক্তির (মুকাতাবা) নির্দেশ (২৪:৩৩), দাসদের সঙ্গে সদাচরণের হাদিস, এবং উম্মে ওয়ালাদের মালিকের মৃত্যুর পর স্বয়ংক্রিয় মুক্তি। এই সংস্কারগুলো বাস্তব, এবং তৎকালীন রোমান বা পারস্য দাসপ্রথার তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে মানবিক ছিল, এটি সততার সঙ্গে স্বীকার করা উচিত।
তবে এই যুক্তির বিরুদ্ধে কয়েকটি গুরুতর আপত্তি আছে, নবী নিজে দাস রাখতেন, কিনতেন, বিক্রি করতেন ও উপহার দিতেন। ইবনুল কাইয়িম তাঁর যাদুল মাআদ গ্রন্থে নবীর মালিকানাধীন দাস-দাসীর দীর্ঘ তালিকা দিয়েছেন। সহিহ মুসলিমে (১৬০২) নবী একজন দাসকে দুজন কৃষ্ণাঙ্গ দাসের বিনিময়ে কেনেন। যিনি দাসপ্রথা বিলোপের লক্ষ্যে কাজ করছেন, তাঁর নিজের আচরণে সেই লক্ষ্য প্রতিফলিত হওয়ার কথা।
যুদ্ধের মাধ্যমে নতুন দাস তৈরির পথ খোলা রাখা হয়েছিল। প্রকৃত বিলোপের পথে প্রথম পদক্ষেপ হতো নতুন দাস সংগ্রহ বন্ধ করা। কিন্তু বন্দিদের দাস বানানোর বিকল্পটি ক্লাসিক্যাল ফিকহে শাসকের বৈধ ক্ষমতা হিসেবে স্থায়ী রয়ে যায়, এবং পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে ইসলামি সাম্রাজ্যগুলোতে বৃহৎ দাস-বাণিজ্য গড়ে ওঠে।
ক্রমান্বয়ের যুক্তি মদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলে দাসপ্রথার ক্ষেত্রে নয় কেন? আপোলজেটিক সাহিত্যে বলা হয় মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল ধাপে ধাপে, তেইশ বছরের মধ্যে। তাহলে একই সময়সীমায় দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করা হয়নি কেন? “নবুওয়াত শেষ হয়ে গেছে” (৩৩:৪০) হওয়ার পর আর কোনো ঐশী ধাপ বাকি থাকে না।
বিলোপ এসেছে বাইরে থেকে। মুসলিম বিশ্বে দাসপ্রথার আনুষ্ঠানিক বিলোপ মূলত ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক ও আন্তর্জাতিক চাপে ঘটে: সৌদি আরব ও ইয়েমেন ১৯৬২ সালে, ওমান ১৯৭০ সালে, মৌরিতানিয়া ১৯৮১ সালে (অপরাধ হিসেবে ঘোষণা ২০০৭ সালে)। বহু আলেম তখন এই বিলোপকে শরিয়াহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বিরোধিতা করেছিলেন।
এর সবচেয়ে ভয়াবহ আধুনিক পরিণতি দেখা গেছে ২০১৪ সালে। ইসলামিক স্টেট (আইএস) ইরাকের সিনজারে ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের ওপর গণহত্যা চালিয়ে হাজার হাজার নারী ও মেয়েশিশুকে যৌন দাসী বানায়। আইএস তাদের মুখপত্র দাবিক-এর চতুর্থ সংখ্যায় (“কিয়ামতের আগে দাসপ্রথার পুনরুজ্জীবন”) এবং একটি ফতোয়া-পুস্তিকায় সরাসরি কুরআন ২৩:৬, ৪:২৪ এবং আওতাস ও বনু মুস্তালিকের হাদিস উদ্ধৃত করে এই কর্মকাণ্ডের বৈধতা দাবি করে। আইএস যে পাঠ্য উদ্ধৃত করেছিল তা কি বানোয়াট ছিল? উত্তর হলো, না। তাদের ব্যাখ্যা ক্লাসিক্যাল ফিকহ থেকে খুব দূরে ছিল না। জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন ২০১৬ সালে ইয়াজিদিদের ওপর আইএসের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করে। যে পাঠ্য এমন কর্মকাণ্ডের জন্য উদ্ধৃতিযোগ্য থাকে, তা সর্বকালীন নৈতিক নির্দেশিকা হিসেবে কতটা নিরাপদ, এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
নারী বিষয়ক বৃহত্তর কাঠামো
নবীর ব্যক্তিগত বৈবাহিক জীবন একটি বৃহত্তর আইনি ও ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোর অংশ, যেখানে নারীর অবস্থান কাঠামোগতভাবে পুরুষের অধীন। সংক্ষেপে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বিধান:
কর্তৃত্ব ও প্রহার: “পুরুষ নারীর ওপর কর্তৃত্বশীল (কাওয়ামুন)… আর যাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা করো, তাদের উপদেশ দাও, শয্যা পৃথক করো এবং প্রহার করো” (৪:৩৪)। আধুনিক ব্যাখ্যাকাররা “প্রহার” শব্দের অর্থ নরম করার চেষ্টা করলেও ক্লাসিক্যাল তাফসিরে এর আক্ষরিক অর্থই গৃহীত।
সাক্ষ্য: আর্থিক লেনদেনে দুজন নারীর সাক্ষ্য একজন পুরুষের সমান (২:২৮২)। সহিহ বুখারিতে (৩০৪) নবী এর কারণ ব্যাখ্যা করেছেন নারীর “বুদ্ধির ঘাটতি” দিয়ে, এবং একই হাদিসে ঋতুকালে নামাজ-রোজা না করাকে “ধর্মের ঘাটতি” বলেছেন।
উত্তরাধিকার: পুত্র কন্যার দ্বিগুণ অংশ পায় (৪:১১)।
জাহান্নাম: নবী জাহান্নামে অধিকাংশ বাসিন্দা নারী দেখেছেন, কারণ তারা স্বামীর প্রতি অকৃতজ্ঞ (বুখারি ২৯, ৩০৪)।
তালাক ও বহুবিবাহ: পুরুষ একতরফাভাবে তালাক দিতে পারে এবং চারজন স্ত্রী রাখতে পারে; নারীর এই অধিকার নেই।
CEDAW-এর অনুচ্ছেদ ২ ও ১৬ বিবাহ, পারিবারিক সম্পর্ক ও উত্তরাধিকারে নারী-পুরুষের সমান অধিকার দাবি করে। বাংলাদেশসহ বহু মুসলিম রাষ্ট্র ঠিক এই অনুচ্ছেদগুলোতে “শরিয়াহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক” হওয়ার কারণে সংরক্ষণ দিয়েছে। এই সংরক্ষণগুলো নিজেই সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ যে ঐতিহ্যগত ইসলামি পারিবারিক আইন এবং আধুনিক নারী-অধিকার মানদণ্ডের মধ্যে সংঘাতটি কাল্পনিক নয়, এবং তা রাষ্ট্রীয় পর্যায়েই স্বীকৃত।
সর্বজনীনতার দাবি ও নৈতিক আপেক্ষিকতার দ্বিধা
এই প্রবন্ধে আলোচিত প্রায় প্রতিটি বিষয়ে মুসলিম আপোলজেটিক্সের কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা হলো ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: সেই যুগে এটিই স্বাভাবিক ছিল। এই প্রতিরক্ষা একটি যৌক্তিক দ্বিধার (dilemma) জন্ম দেয়, যা নিম্নরূপে উপস্থাপন করা যায়:
প্রথম বিকল্প: মুহাম্মদের আচরণ তাঁর যুগের মানদণ্ডে বিচার্য, কারণ নৈতিক মানদণ্ড কালের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। সেক্ষেত্রে তাঁর আচরণ সর্বকালের জন্য আদর্শ হতে পারে না; সপ্তম শতাব্দীর আরবের জন্য গ্রহণযোগ্য আচরণ একবিংশ শতাব্দীতে অনুসরণীয় নয়। এতে ৩৩:২১ ও ২১:১০৭-এর সর্বজনীন দাবি দুর্বল হয়ে পড়ে, এবং শরিয়াহর চিরন্তনতার দাবিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
দ্বিতীয় বিকল্প: মুহাম্মদের আচরণ চিরন্তন ও সর্বজনীন আদর্শ। সেক্ষেত্রে ছয় বছরের মেয়ের বিবাহ, যুদ্ধবন্দিনীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক এবং দাসী রাখা আজও নৈতিকভাবে অনুকরণযোগ্য হতে হবে। অথচ আজকের অধিকাংশ মুসলিম, আলেম ও মুসলিম রাষ্ট্র নিজেরাই এই আচরণগুলো আইনত নিষিদ্ধ করেছে বা নৈতিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে।
আপোলজেটিক্স সাধারণত দুটি বিকল্প মিশিয়ে ফেলে: সমালোচনার সময় প্রথম বিকল্প (ঐতিহাসিক আপেক্ষিকতা), আর প্রচারের সময় দ্বিতীয় বিকল্প (চিরন্তন আদর্শ)। এটি যুক্তিবিদ্যায় “মট অ্যান্ড বেইলি” (motte-and-bailey) কৌশল নামে পরিচিত। আরও লক্ষণীয় যে, ঐতিহাসিক আপেক্ষিকতার যুক্তিটি মূলত একটি ধর্মনিরপেক্ষ যুক্তি; এটি নৈতিকতাকে সামাজিক বিবর্তনের ফল হিসেবে দেখে। একজন বিশ্বাসী যখন এই যুক্তি ব্যবহার করেন, তখন তিনি অজান্তেই স্বীকার করে নেন যে মানবসমাজ ধর্মীয় উৎসের বাইরে থেকে নৈতিক উন্নতি অর্জন করেছে, এবং সেই উন্নত মানদণ্ড দিয়েই তিনি ধর্মীয় উৎসের কিছু অংশকে “সেকালের জন্য” বলে সীমাবদ্ধ করছেন। অর্থাৎ নৈতিক কর্তৃত্ব কার্যত আধুনিক মানবিক বিবেকের হাতেই চলে যায়।
এছাড়া “সেকালে এটাই স্বাভাবিক ছিল” দাবিটিও আংশিক। সেই একই যুগে সাহাবিদের মধ্যে আওতাসের বন্দিনীদের নিয়ে দ্বিধা ছিল (সহিহ মুসলিম ১৪৫৬); জয়নাবের ঘটনায় সামাজিক অস্বস্তি ছিল বলেই কুরআনকে বিশেষভাবে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে; আয়েশা নিজেই নবীর বিশেষ সুবিধা নিয়ে কটাক্ষ করেছেন; আর নাবালিকা বিবাহের বিরুদ্ধে ইবনে শুবরুমার মত ছিল। নৈতিক অস্বস্তি সেই যুগেও অনুভূত হয়েছিল; কিন্তু প্রতিবারই ঐশী অনুমোদন সেই অস্বস্তিকে দমন করেছে।
একজন নবীর কাছ থেকে প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই একজন সাধারণ গোত্রপ্রধানের চেয়ে বেশি। যদি সর্বজ্ঞ স্রষ্টা মানবজাতির জন্য শেষ ও পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা পাঠান, তবে সেই নির্দেশনায় “কোনো মানুষ অন্য মানুষের মালিক হতে পারে না” বা “শিশুকে বিয়ে দেওয়া যাবে না” এমন একটি স্পষ্ট বাক্যের অনুপস্থিতি ব্যাখ্যা দাবি করে, বিশেষত যখন একই গ্রন্থ শূকরের মাংস বা সুদের মতো বিষয়ে দ্ব্যর্থহীন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
উপসংহার
এই প্রবন্ধে মুসলিম ঐতিহ্যের নিজস্ব সর্বাধিক প্রামাণ্য উৎস থেকে দেখানো হয়েছে যে নবী মুহাম্মদের বৈবাহিক ও যৌন জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, বিশেষত ছয় বছর বয়সে আয়েশার সঙ্গে বিবাহ ও নয় বছর বয়সে দাম্পত্য, যুদ্ধে স্বজনহারা বন্দিনী নারীদের গ্রহণ, এবং দাসীদের সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ক, আধুনিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, শিশু অধিকার আইন ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক। আজকের আইনে এসব কর্মকাণ্ড শিশু যৌন নির্যাতন, যৌন দাসত্ব ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞায় পড়ে।
প্রবন্ধটি এও দেখিয়েছে যে নবীর জন্য কুরআনে একাধিক বিশেষ ছাড় নির্ধারিত হয়েছিল, যা সাধারণ মুসলিমদের জন্য প্রযোজ্য ছিল না, এবং এসব ছাড় বারবার তাঁর ব্যক্তিগত ইচ্ছার অনুকূলে এসেছে, যা তাঁর নিজের স্ত্রী আয়েশার পর্যবেক্ষণেও ধরা পড়েছে। আধুনিক শাসনতত্ত্বের ভাষায় এটি স্বার্থের সংঘাতের একটি ধ্রুপদি উদাহরণ।
যদি কোনো ব্যক্তিকে সর্বকালের সব মানুষের জন্য অনুসরণীয় নৈতিক আদর্শ হিসেবে দাবি করা হয়, তবে সর্বকালের নৈতিক মানদণ্ডে তাঁকে পরীক্ষার দায়ও সেই দাবিরই অংশ। বাস্তবে আধুনিক মুসলিম সমাজগুলো নিজেরাই বাল্যবিবাহ, দাসপ্রথা ও যুদ্ধবন্দিনীর যৌন ব্যবহার আইনত নিষিদ্ধ করে এই মূল্যায়নের সঙ্গে কার্যত একমত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এই ব্যবহারিক স্বীকৃতিকে কি একটি সৎ ধর্মতাত্ত্বিক পুনর্মূল্যায়নে রূপান্তরিত করা হবে, নাকি সর্বজনীনতার দাবি এবং আধুনিক বিবেকের মধ্যকার ফাঁকটি অস্বীকারের মাধ্যমে ঢেকে রাখা হবে। শিশু, নারী ও দুর্বলতম মানুষদের নিরাপত্তার স্বার্থে এই প্রশ্নটি প্রকাশ্যে, যুক্তিনিষ্ঠভাবে ও পারস্পরিক সম্মানের সঙ্গে আলোচিত হওয়া প্রয়োজন।
দাসপ্রথা নিয়ে ইসলাম-বিতর্কে একটা সস্তা কথা খুব চলে। বলা হয়, “সপ্তম শতকে সবাই দাস রাখত, শুধু ইসলামকে দোষ দেন কেন?” কথাটা তথ্যগতভাবে ঠিক। রোম, পারস্য, বাইজান্টিয়াম, ভারত, চীন, সব জায়গাতেই দাস ছিল। ইসলাম দাসপ্রথা আবিষ্কার করেনি। কিন্তু এই সত্যটা যে প্রশ্নের উত্তর দেয়, সেটা আসল প্রশ্ন না।
সূচিপত্র
আসল প্রশ্ন তিনটা কি?
এক: ইসলামের মূল উৎস, কুরআন ও হাদিস, দাসপ্রথা নিয়ে ঠিক কী বলেছে? নিয়ন্ত্রণ করেছে, না বিলোপ করেছে?
দুই: ইসলাম যদি পারস্য বা রোমান আইনের মতো একটা “মানবরচিত” আইনব্যবস্থা হতো, তাহলে “যুগের সীমাবদ্ধতা” যুক্তিটা যথেষ্ট হতো। কিন্তু ইসলামের দাবি অন্যরকম। এখানে বিধানদাতা সর্বজ্ঞ, কালোত্তীর্ণ, নৈতিকতার উৎস। কুরআন নিজেকে বলে “সব যুগের জন্য পথনির্দেশ”। তাহলে একজন সর্বজ্ঞ বিধানদাতা কেন সুদ, মদ, কন্যাশিশু হত্যা, এগুলো সরাসরি নিষিদ্ধ করলেন, অথচ এক মানুষের ওপর আরেক মানুষের মালিকানা নিষিদ্ধ করলেন না?
তিন: বিধানটা কি অতীত, না বর্তমান? ইসলামি আইনশাস্ত্রে কোনো বিধান “বাতিল” হয় শুধু নসখ (রহিতকরণ) দ্বারা। দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করে কোনো আয়াত নেই, কোনো হাদিস নেই, কোনো ইজমা নেই। তাহলে বর্তমান আধুনিক যুগে বিধানটার আইনি মর্যাদা কী?
এই প্রবন্ধ এই তিনটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজবো। কোনো আবেগ নয়, কোনো ভদ্রতাসূচক ঘোরপ্যাঁচ নয়, শুধু ইসলামিক উৎস, ফিকহ, ইতিহাস আর যুক্তি দিয়ে বিচার করবো।
কুরআনে দাসপ্রথার জন্য কোনো একক শব্দ নেই। প্রধান পরিভাষা একটি বাক্যাংশ: مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ (মা মালাকাত আয়মানুকুম ) অর্থাৎ “তোমাদের ডান হাত যাদের মালিক হয়েছে”। এই বাক্যাংশ ও তার নিকট রূপভেদ কুরআনে প্রায় ১৫ বার আসে। এছাড়া আছে ‘আব্দ (দাস), আমা (দাসী), ফাতাত (দাসী), রাকবা (দাস), মিল্ক আল ইয়ামিন (ডান হাতের মালিকানা)।
লক্ষণীয়: কুরআনের কোথাও দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করা হয়নি। কোথাও “দাস রাখা যাবে না” বলা হয়নি। যা আছে তা তিন ভাগে ভাগ করা যায়—
ক) মালিকানার স্বীকৃতি ও নিয়ন্ত্রণ: দাস আছে, এটা ধরে নিয়ে বিধান দেওয়া হয়েছে।
খ) যৌন অধিকার: মালিকের জন্য দাসীর দেহ বৈধ ঘোষণা।
গ) মুক্তির উৎসাহ: দাস মুক্ত করাকে পুণ্য ও কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) হিসেবে নির্ধারণ। (দাসমুক্তি ইসলামপূর্ব সমাজে প্রচলিত ছিল)
ইসলামে দাস পাওয়ার প্রকিয়া কি?
একটা প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে না, যদি না তার সরবরাহ-ব্যবস্থা থাকে। ইসলামি আইনে দাসত্বের প্রধান উৎস হলো যুদ্ধবন্দিত্ব, অর্থাৎ জিহাদের মাধ্যমে অর্জন। এছাড়া দ্বিতীয় উৎস: দাসীর গর্ভজাত সন্তান, যে জন্মসূত্রে দাস, এবং বাজার থেকে ক্রয় কৃত দাস।
কুরআন যুদ্ধবন্দি সম্পর্কে কি বলে?
“যখন তোমরা কাফিরদের সাথে মুখোমুখি হও, তখন গর্দানে আঘাত করো। অবশেষে যখন তাদের পরাভূত করবে তখন তাদের শক্ত করে বাঁধবে। তারপর হয় অনুগ্রহ, নয় মুক্তিপণ…” — কুরআন ৪৭:৪
অধুনিক আপোলজিস্টরা ৪৭:৪ থেকে যুক্তি দেন যে কুরআন শুধু দুটো বিকল্প দিয়েছে, মুক্তি বা মুক্তিপণ, দাসত্ব নয়। কিন্তু ধ্রুপদী মুফাসসির ও ফকিহদের সর্বসম্মত অবস্থান এর বিপরীত: এই আয়াত চারটি বিকল্প দেয়, হত্যা, দাসত্ব, মুক্তিপণ, বা বিনা শর্তে মুক্তি, এবং ইমামের ইজতিহাদের বিষয়। ইবনে রুশদ তাঁর বিদায়াতুল মুজতাহিদ-এ এই মতভেদ ও সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থান বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করেছেন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হলো নবীর নিজের প্র্যাকটিস, যা নিচে আসছে। ইসলামের ঐতিহাসিক ঘটনাবলি থেকে আমরা এর অর্থ পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারি।
বনু কুরায়যা গণহত্যা (৫ হিজরি)
খন্দকের যুদ্ধের অবরোধ ব্যর্থ হওয়ার পর মদিনার তৃতীয় ইহুদি গোত্র বনু কুরায়যা অভিযুক্ত হয় চুক্তিভঙ্গ ও কুরাইশদের সাথে যোগসাজশের। পঁচিশ দিনের অবরোধের পর তারা বিনা শর্তে মুসলিম বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। বিচারের ভার দেওয়া হয় সাদ ইবনে মুআযকে, যিনি ছিলেন বনু আউস গোত্রের নেতা, অর্থাৎ কুরায়যার প্রাক্তন মিত্রগোষ্ঠীর প্রধান, এবং যিনি নিজে খন্দকে তীরবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুশয্যায় ছিলেন। ” সাদ বললেন: “আমি রায় দিচ্ছি যে তাদের যোদ্ধাদের হত্যা করা হবে, নারী ও শিশুদের বন্দি করা হবে, এবং তাদের সম্পত্তি বণ্টন করা হবে।” নবী বললেন, “তুমি আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী ফয়সালা করেছ।” সূত্র: সহিহ বুখারি ৩০৪৩, ৩৮০৪, ৪১২১, ৪১২২; সহিহ মুসলিম ১৭৬৮।
কুরআনে ঘটনাটির অনুমোদন:
“আর কিতাবীদের মধ্যে যারা তাদের সাহায্য করেছিল, তিনি তাদের দুর্গ থেকে নামিয়ে আনলেন এবং তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করলেন। একদলকে তোমরা হত্যা করলে এবং একদলকে বন্দি করলে। আর তিনি তোমাদের উত্তরাধিকারী করলেন তাদের ভূমি, ঘরবাড়ি ও ধনসম্পদের, এবং এমন ভূমির যাতে তোমরা পা রাখোনি।” — কুরআন ৩৩:২৬–২৭
হত্যার জন্য নির্বাচনের পদ্ধতি ছিল গোপনাঙ্গের লোম পরীক্ষা, এখানে একটা বাস্তব সমস্যা ছিল, যেটা রায়ের ভাষা থেকে সরাসরি উঠে আসে। রায় বলছে “যোদ্ধাদের হত্যা, নারী ও শিশুদের বন্দি”। কিন্তু কে যোদ্ধা আর কে শিশু, তা নির্ধারণ করবে কে? সপ্তম শতকের আরবে জন্মনিবন্ধন ছিল না, বয়সের কাগজ ছিল না।
সমাধান হিসেবে যে পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়, তা একজন প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষায় নথিবদ্ধ আছে। বেঁচে যাওয়া একটি বালক, আতিয়্যা আল-কুরাযি—পরবর্তীতে হাদিসের বর্ণনাকারী হন। তাঁর বর্ণনা:
আতিয়্যা আল-কুরাযি (রা.) বলেন: “আমি বনু কুরায়যার বন্দিদের মধ্যে ছিলাম। তাঁরা [সাহাবিরা] আমাদের পরীক্ষা করলেন। যাদের (গোপনাঙ্গের) লোম গজিয়েছিল তাদের হত্যা করা হলো, আর যাদের গজায়নি তাদের হত্যা করা হলো না। আমি ছিলাম তাদের মধ্যে যাদের লোম গজায়নি [তাই আমাকে ছেড়ে দেওয়া হলো]।”
নাসাঈর আরেকটি বর্ণনায় কাসির ইবনে আস-সাইব বলেন: বনু কুরায়যার সন্তানরা তাঁকে জানিয়েছে যে তাদের নবীর সামনে হাজির করা হয়েছিল, এবং যারা বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছেছিল বা যাদের গোপনাঙ্গে লোম গজিয়েছিল তাদের হত্যা করা হয়, আর বাকিদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
বন্দি নারী ও শিশুদের পরিণতি:
ক) বণ্টন। ইবনে ইসহাক: “তারপর রাসুল বনু কুরায়যার সম্পত্তি, স্ত্রী ও সন্তানদের মুসলিমদের মধ্যে বণ্টন করলেন।”
খ) বিক্রয়। ইবনে ইসহাক ও তাবারি উভয়েই লিপিবদ্ধ করেছেন: “তারপর রাসুল সাদ ইবনে যায়েদ আল-আনসারিকে (বনু আবদুল আশহালের) বনু কুরায়যার কিছু বন্দি নারীসহ নজদে পাঠালেন, এবং তাদের বিনিময়ে ঘোড়া ও অস্ত্র কিনলেন।”
এই বাক্যটার তাৎপর্য মনোযোগ নিয়ে দেখুন। বন্দি নারীরা এখানে শুধু ভোগের বস্তু নন, তাঁরা বিনিময়যোগ্য মুদ্রা। তাঁদের রূপান্তরিত করা হচ্ছে যুদ্ধসামগ্রীতে, যা দিয়ে পরবর্তী অভিযান চালানো হবে, যা থেকে আরও বন্দি আসবে। যন্ত্রটা এখানে নিজেকে অর্থায়ন করছে।
গ) নবীর নিজের অংশ: রায়হানা বিনতে যায়েদ (কারো বর্ণনায় বিনতে আমর): “রাসুল কুরায়যার ইহুদি নারীদের মধ্য থেকে রায়হানা বিনতে আমরকে নিজের জন্য বেছে নিলেন। সে তাঁর দাসী (উপপত্নী) হয়ে রইল। তাঁর মৃত্যুর সময়ও সে তাঁর মালিকানায় ছিল।” — ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা
বনু মুস্তালিক যুদ্ধ (৫/৬ হিজরি)
মুরাইসি কূপের অভিযানে গোত্রটি অতর্কিতে আক্রান্ত হয়; বন্দি হন বিপুলসংখ্যক নারী ও শিশু। এই অভিযান থেকেই আসে ইসলামি সূত্রের সবচেয়ে স্পষ্ট বর্ণনাগুলোর একটি:
আবু সাইদ আল-খুদরি (রা.): “আমরা রাসুলুল্লাহ এর সাথে বনু মুস্তালিকের অভিযানে বের হলাম এবং উৎকৃষ্ট আরব নারীদের বন্দি করলাম। আমরা তাদের কামনা করছিলাম, কারণ দীর্ঘদিন স্ত্রীদের থেকে দূরে ছিলাম; আবার আমরা তাদের মুক্তিপণও চাইছিলাম। তাই আমরা আযল করে সহবাসের সিদ্ধান্ত নিলাম… [নবী] বললেন: ‘তোমরা এটা না করলেই ভালো। কিয়ামত পর্যন্ত যে প্রাণ সৃষ্টি হওয়ার, তা হবেই।’” সূত্র: সহিহ বুখারি ২২২৯, ২৫৪২, ৪১৩৮, ৫২১০, ৬৬০৩, ৭৪০৯; সহিহ মুসলিম ১৪৩৮(ক)।
বুখারি ৪১৩৮-এর বর্ণনায় সাহাবির প্রশ্নটি আরও নগ্ন বা ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে: “হে আল্লাহর রাসুল! আমরা যুদ্ধবন্দি হিসেবে দাসী পাই, এবং আমরা তাদের দাম চাই—আযল সম্পর্কে আপনার মত কী?”
এই একটি বাক্যে ব্যবস্থাটির পুরো অর্থনীতি ধরা পড়ে: একই নারী একই সময়ে যৌনসঙ্গী এবং বিক্রয়যোগ্য সম্পদ। গর্ভধারণ সমস্যা, কারণ তাতে দাম কমে এবং সন্তান জন্মালে সে উম্মে ওয়ালাদ হয়ে বিক্রয়-অযোগ্য হয়ে যায়।
এই অভিযান থেকেই আসেন জুওয়াইরিয়া বিনতে আল-হারিস—গোত্রপতির কন্যা, যিনি বন্দি হয়ে সাবিত ইবনে কায়সের ভাগে পড়েন এবং মুকাতাবা (মুক্তিচুক্তি) করতে চাইলে নবী তাঁর মূল্য পরিশোধ করে বিয়ে করেন (সুনানে আবু দাউদ ৩৯৩১)। এই বিয়ের ফলে মুসলিমরা বনু মুস্তালিকের বাকি বন্দিদের মুক্ত করে দেন “এরা তো এখন রাসুলের শ্বশুরকুল।”
খায়বার (৭ হিজরি)
মদিনার ১৫৩ কিলোমিটার উত্তরে সমৃদ্ধ ইহুদি মরূদ্যান, দুর্গগুলো একে একে পতিত হয়।
আনাস (রা.): নবী ফজরের সালাত অন্ধকার থাকতেই আদায় করলেন, তারপর সওয়ার হয়ে বললেন, “আল্লাহু আকবার! খায়বার ধ্বংস হলো…” তারপর তিনি তাদের পুরুষদের হত্যা করলেন এবং তাদের নারী, শিশু ও সম্পদ মুসলিমদের মধ্যে বণ্টন করলেন। সূত্র: সহিহ বুখারি ৩৭১, ৩৭১৩(সদৃশ), ৪২০০; সহিহ মুসলিম ১৩৬৫।
সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই: বনু নাদিরের নেতা হুয়াই ইবনে আখতাবের কন্যা (হুয়াই নিজে বনু কুরায়যার পরিখায় নিহত হয়েছিলেন)। খায়বারে তাঁর স্বামী কিনানা ইবনে আর-রাবি নিহত হন, ইবনে ইসহাকের বর্ণনায়, গুপ্তধনের সন্ধানে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। বিয়ের কয়েকদিনের মাথায় তিনি বিধবা ও বন্দি। প্রথমে দিহইয়া আল-কালবির ভাগে পড়েন। সৌন্দর্যের বর্ণনা নবীর কানে গেলে তিনি তাঁকে নিজের জন্য নেন; দিহইয়াকে অন্য একাধিক বন্দি নারী দেওয়া হয় (এক বর্ণনায় সাতজন)।
আনাস (রা.): “নবী খায়বার ও মদিনার মাঝামাঝি এক জায়গায় তিন দিন অবস্থান করলেন এবং সেখানেই সাফিয়্যা বিনতে হুয়াইয়ের সাথে বাসর সম্পন্ন করলেন।” সূত্র: সহিহ বুখারি ৫১৫৯; আরও: বুখারি ২২৩৫, ৪২১১, ৫১৬৯।
সময়রেখাটা টেক্সট থেকেই স্পষ্ট, পিতা নিহত (দুই বছর আগে), স্বামী নিহত (কয়েক ঘণ্টা/দিন আগে), গোত্র বিধ্বস্ত, তিনি নিজে গনিমতের অংশ, এবং তিন দিনের মাথায় ফেরার পথেই বিবাহ সম্পন্ন। এখানে সম্মতির প্রশ্নটি তোলাই যায় না, কারণ যে-কাঠামোয় ঘটনাটি ঘটছে সেখানে প্রত্যাখ্যানের কোনো আইনি অস্তিত্ব নেই।
হাওয়াযিন ও আওতাস (৮ হিজরি)
মক্কা বিজয়ের পর হুনায়নের যুদ্ধ। হাওয়াযিন ও সাকিফ গোত্র তাদের পরিবার-পরিজন সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধে এসেছিল, ফলে পরাজয়ের সাথে সাথেই বিপুল বেসামরিক জনগোষ্ঠী বন্দি হয়ে যায়। ইবনে ইসহাকের হিসাব: ৬,০০০ নারী ও শিশু বন্দি; ২৪,০০০ উট; ৪০,০০০-এর বেশি ছাগল-ভেড়া; ৪,০০০ উকিয়া রুপা।
আওতাসে পাঠানো বাহিনী থেকেই আসে সেই বর্ণনা যা কুরআন ৪:২৪-এর শানে নুযুল:
আবু সাইদ আল-খুদরি (রা.): “হুনায়নের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) আওতাসে একটি বাহিনী পাঠান। তারা শত্রুর মুখোমুখি হয়ে যুদ্ধ করে, তাদের পরাজিত করে এবং বন্দি করে। সাহাবিদের কেউ কেউ বন্দিনীদের সাথে সহবাসে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন, কারণ তাদের স্বামীরা মুশরিক ছিল। তখন আল্লাহ নাজিল করেন: ‘এবং বিবাহিতা নারীরাও (নিষিদ্ধ), তবে তোমাদের ডান হাত যাদের মালিক হয়েছে তারা ছাড়া’, অর্থাৎ ইদ্দত শেষ হলে তারা তাদের জন্য হালাল।” সূত্র: সহিহ মুসলিম ১৪৫৬(ক); সুনানে আবু দাউদ ২১৫৫; সুনানে নাসাঈ ৩৩৩৩; জামে তিরমিযি ১১৩২; মুসনাদে আহমাদ (ইবনে কাসির-উদ্ধৃত); আল-ওয়াহিদি, আসবাবুন নুযুল।
মুহাম্মদের মৃত্যুর পর কি হল?
এই তালিকা নবীর জীবদ্দশাতেই শেষ নয়, রিদ্দার যুদ্ধ (১১–১২ হি.): আবু বকরের অধীনে বিদ্রোহী আরব গোত্রদের বিরুদ্ধে অভিযানে বন্দিত্ব। বনু হানিফা ও অন্যান্য গোত্র থেকে বন্দি নারীরা সাহাবিদের মধ্যে বণ্টিত হন, খাওলা বিনতে জাফর, যাঁর গর্ভে আলির পুত্র মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়্যা জন্মান, তাঁদের একজন।
ফুতুহ (৭ম শতক): সিরিয়া, মিসর, ইরাক, পারস্য বিজয়ে বিপুল বন্দিত্ব। মাদাইন ও নাহাবান্দের পর হাজার হাজার পারসিক বন্দি মদিনায় আসে। সিন্ধু (৭১১ খ্রি.): মুহাম্মাদ বিন কাসিমের অভিযানে দেবল ও মুলতান থেকে বন্দি প্রেরণের বিবরণ চাচনামা ও আল-বালাযুরির ফুতুহুল বুলদান-এ আছে।এরপর উমাইয়া, আব্বাসি, ফাতিমি, গজনবি, দিল্লি সালতানাত, উসমানীয়, চৌদ্দ শতাব্দী ধরে অবিচ্ছিন্ন ছিল। কোনো পর্যায়েই কোনো ফকিহ বলেননি “এই ব্যবস্থা বন্ধ করতে হবে।” কারণ ফিকহি দৃষ্টিতে বলার কিছু ছিল না, ব্যবস্থাটা ইসলামে বৈধ, নবীর সুন্নাহ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত, কুরআন দ্বারা অনুমোদিত।
দাসীদের প্রতি ইসলামের যৌনাচার
এটাই সবচেয়ে অস্বস্তিকর অংশ, এবং এটাই সবচেয়ে সুস্পষ্টভাবে নথিবদ্ধ। কুরআন বৈধ যৌনতার সীমা নির্ধারণ করেছে দুই জায়গায়, প্রায় একই ভাষায়:
“এবং যারা তাদের যৌনাঙ্গ সংযত রাখে, তাদের স্ত্রী অথবা তাদের ডান হাত যাদের মালিক হয়েছে (দাসী) তাদের ক্ষেত্রে ছাড়া, এতে তারা তিরস্কৃত হবে না। অতঃপর কেউ এর বাইরে কিছু চাইলে তারাই সীমালঙ্ঘনকারী।” — কুরআন ২৩:৫–৭ এবং কার্যত অভিন্ন ভাষায় কুরআন ৭০:২৯–৩১ এ একইভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এই দুই আয়াতের গঠনটা লক্ষ করুন। এটা নিছক অনুমতি নয়, এটা সংজ্ঞা। বৈধ যৌনসঙ্গী দুই শ্রেণির: স্ত্রী, এবং মালিকানাধীন নারী অর্থাৎ দাসী। এই দুইয়ের বাইরে যা কিছু, তা সীমালঙ্ঘন। অর্থাৎ, ইসলামে দাসীর সাথে যৌনসংগমের ক্ষেত্রে পূর্ণ ছাড় দিয়ে রেখেছে।
“যদি আশঙ্কা করো যে ইয়াতিমদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে বিয়ে করো নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভালো লাগে, দুই, তিন বা চার। আর যদি আশঙ্কা করো যে সুবিচার করতে পারবে না, তবে একজনকে, অথবা তোমাদের ডান হাত যাদের মালিক হয়েছে (অর্থাৎ দাসী)।” — কুরআন ৪:৩
এখানে কাঠামোটা সরাসরি: স্ত্রীর সংখ্যায় সীমা চার, কিন্তু দাসীর ক্ষেত্রে বিকল্পটি সংখ্যাহীন। ধ্রুপদী ফিকহ এই পাঠ ধরে রেখেছে—চারটি সুন্নি মাযহাবের কেউই দাসীর সংখ্যায় কোনো ঊর্ধ্বসীমা আরোপ করেনি।
ইসলামের আরো কিছু বিধান যা শুনলে যেকোনো মানসিকভাবে সুস্থ মানুষের মনে প্রশ্নের জন্ম দেবে। যুদ্ধবন্দীনি দাসী যদি বিবাহিত হয়, তাহলে বিধান কি?
“এবং বিবাহিতা নারীরাও (তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ), তবে তোমাদের ডান হাত যাদের মালিক হয়েছে (দাসী) তারা ছাড়া। এটা তোমাদের প্রতি আল্লাহর বিধান।” — কুরআন ৪:২৪
এই আয়াতের শানে নুযুল: আবু সাইদ আল-খুদরি বলেন: হুনায়নের দিন রাসুলুল্লাহ আওতাসে একটি বাহিনী পাঠান। তারা শত্রুর মুখোমুখি হয়ে যুদ্ধ করে, তাদের পরাজিত করে এবং বন্দি করে। সাহাবিদের কেউ কেউ বন্দিনীদের সাথে সহবাসে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন, কারণ তাদের স্বামীরা মুশরিক ছিল। তখন আল্লাহ এই আয়াত নাজিল করেন: “এবং বিবাহিতা নারীরাও, তবে তোমাদের ডান হাত যাদের মালিক হয়েছে তারা ছাড়া”, অর্থাৎ ইদ্দত শেষ হলে তারা তাদের জন্য হালাল।
এই বর্ণনার তাৎপর্য বোঝা জরুরি। এটা শুধু বলছে না যে দাসীর সাথে যৌনতা বৈধ। এটা বলছে:
১. সাহাবিদের একটা নৈতিক দ্বিধা ছিল, তাঁরা অন্যের স্ত্রীর সাথে সহবাস করতে অস্বস্তি বোধ করছিলেন।
২. ঐশী প্রত্যাদেশ সেই দ্বিধাটা দূর করেছে, তৈরি করেনি।
৩. এই নারীদের স্বামীরা তখনো জীবিত ছিলেন (অনেক ক্ষেত্রে যুদ্ধবন্দি হিসেবে একই শিবিরে)।
৪. একমাত্র শর্ত ছিল ইস্তিবরা, এক হায়েজ অপেক্ষা, যাতে গর্ভের পিতৃত্ব নিয়ে সংশয় না থাকে।
সম্মতির প্রশ্ন এখানে অনুপস্থিত। শুধু অনুপস্থিত নয়, কাঠামোগতভাবে অপ্রাসঙ্গিক। তাফসিরে জালালাইন সরাসরি লিখেছে: বন্দিনী নারীরা বৈধ “যদিও দারুল হারবে তাদের স্বামী থাকে”, শুধু এক হায়েজ অপেক্ষার পর।
ইসলামে আযল (বীর্যপাতের আগে বিচ্ছিন্ন হওয়া) এর বিধান
আবু সাইদ আল-খুদরি বর্ণনা করেন: আমরা রাসুলুল্লাহ -এর সাথে বনু মুস্তালিকের অভিযানে বের হলাম এবং উৎকৃষ্ট আরব নারীদের বন্দি করলাম। আমরা তাদের কামনা করছিলাম, কারণ দীর্ঘদিন স্ত্রীদের থেকে দূরে ছিলাম; আবার আমরা তাদের মুক্তিপণও চাইছিলাম।তাই আমরা আযল (বীর্যপাতের আগে বিচ্ছিন্ন হওয়া) করে সহবাস করার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু আমরা বললাম, রাসুলুল্লাহ আমাদের মধ্যেই আছেন, তাঁকে জিজ্ঞেস না করে কেন? আমরা জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন: “তোমরা এটা না করলেই ভালো। কিয়ামত পর্যন্ত যে প্রাণ সৃষ্টি হওয়ার, তা হবেই।” (মুহাম্মদ এখানে তার সাহাবিদের আযল ছাড়াই মিলনে অনুমতি দিলেন।)
এই হাদিসটি দুটো কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, প্রশ্নটি লক্ষ করুন। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করেননি “এদের সাথে সহবাস করা কি জায়েজ?” সেটা ধরেই নেওয়া হয়েছে। প্রশ্নটা ছিল প্রযুক্তিগত, গর্ভনিরোধ করা যাবে কি না। এবং কারণটাও স্পষ্টভাবে বলা: গর্ভবতী হলে মুক্তিপণে বিক্রয়মূল্য কমে যায় (কারণ গর্ভবতী দাসীর দাম কম, এবং সন্তান জন্মালে সে উম্মে ওয়ালাদ হয়ে বিক্রয়-অযোগ্য হয়ে যায়)।
দ্বিতীয়ত, উত্তরটা লক্ষ করুন। নিষেধাজ্ঞা আসেনি। এসেছে ভাগ্যতত্ত্বের একটি মন্তব্য। বুখারির অন্য বর্ণনায় (৪১৩৮) সাহাবিরা স্পষ্টভাবে বলেছেন “আমরা তাদের দাম চাই”, অর্থাৎ সহবাস ও পুনর্বিক্রয় একই সাথে।
এই মুহূর্তটাকে একটু ধরে রাখুন। একদল পুরুষ, যাঁদের হাতে কয়েক ঘণ্টা আগে যে-নারীদের গোত্র পরাজিত হয়েছে, তাঁরা সেই নারীদের সাথে সহবাসের বাণিজ্যিক-প্রযুক্তিগত দিক নিয়ে পরামর্শ চাইছেন। উত্তরে যে-নৈতিক প্রশ্নটি উঠতে পারত, “এই নারীরা কি রাজি?”, সেটি প্রশ্নকর্তা বা উত্তরদাতা, কারো মনেই ওঠেনি। কারণ কাঠামোটাই এমন যে এই প্রশ্নের কোনো স্থান ইসলামে নেই।
মুহাম্মদের জীবন থেকে নেয়া
ইসলামি আইনশাস্ত্রে নবীর জীবন ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি আইনের উৎস। উসুলুল ফিকহের প্রাথমিক পাঠ: শরিয়ার দলিল চারটি, কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াস। আর সুন্নাহ তিন প্রকার: নবীর কথা (কওল), নবীর কাজ (ফি’ল), এবং নবীর মৌন সম্মতি (তাকরির)।
অর্থাৎ নবী যা করেছেন, তা কেবল ঘটেনি, তা বৈধতা প্রতিষ্ঠা করেছে। কুরআন নিজেই এই ভিত্তি স্থাপন করে:
“নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসুলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ (উসওয়া হাসানা)।” — কুরআন ৩৩:২১
“রাসুল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ করো, আর যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো।” — কুরআন ৫৯:৭
তাই নবীর দাস-দাসী সংক্রান্ত আচরণ পরীক্ষা করা ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, এটা আইনের উৎস পরীক্ষা করা। যদি তিনি দাস কিনে থাকেন, তবে দাস কেনা বৈধ। যদি তিনি বন্দিনীর সাথে সহবাস করে থাকেন, তবে বন্দিনীর সাথে সহবাস বৈধ। ফকিহরা ঠিক এই যুক্তিতেই বিধান রচনা করেছেন, আমরা নতুন কিছু করছি না, শুধু তাঁদের পদ্ধতিটা অনুসরণ করছি।
কুরআনের বিশেষ ধারাগুলো
“হে নবী! আমি তোমার জন্য হালাল করেছি তোমার স্ত্রীদের, যাদের মোহর তুমি দিয়েছ, এবং তোমার ডান হাত যাদের মালিক হয়েছে, আল্লাহ যাদের গনিমত হিসেবে তোমাকে দিয়েছেন; এবং তোমার চাচার কন্যা, ফুফুর কন্যা, মামার কন্যা, খালার কন্যা, যারা তোমার সাথে হিজরত করেছে; এবং কোনো মুমিন নারী যদি নিজেকে নবীর কাছে সমর্পণ করে, যদি নবী তাকে বিয়ে করতে চান—এটা বিশেষভাবে তোমার জন্য, অন্য মুমিনদের জন্য নয়…” — কুরআন ৩৩:৫০
আরবি বাক্যাংশটি লক্ষণীয়: مِمَّا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَيْكَ (mimmā afā’a Allāhu ‘alayk)—”আল্লাহ তোমাকে যা ফাই হিসেবে দিয়েছেন”। ফাই একটি নির্দিষ্ট আইনি পরিভাষা: যুদ্ধলব্ধ সম্পদ। আয়াতটি রূপক ভাষা ব্যবহার করছে না; এটি একটি সম্পত্তি-বিভাগ নির্দেশ করছে, এবং সেই বিভাগের মধ্যে মানুষ অন্তর্ভুক্ত।
আয়াতটি নিজেই ঘোষণা করছে এটি বিশেষ ছাড় (খালিসাতান লাকা মিন দুনিল মুমিনিন)—অর্থাৎ কিছু সুবিধা কেবল নবীর জন্য, সাধারণ মুমিনদের জন্য নয়। এই বিশেষত্ব প্রধানত স্ত্রীসংখ্যা ও হিবা (আত্মসমর্পণকারী নারী) সংক্রান্ত। কিন্তু দাসী-ভোগের অধিকারটি বিশেষ নয়, সেটি ২৩:৫–৬ ও ৭০:২৯–৩০ অনুযায়ী সব মুমিন পুরুষের জন্যই প্রযোজ্য।
এই আয়াতটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, এবং কম আলোচিত:
“এরপর তোমার জন্য কোনো নারী হালাল নয়, এবং তাদের বদলে অন্য স্ত্রী গ্রহণও নয়, যদিও তাদের সৌন্দর্য তোমাকে মুগ্ধ করে, তবে তোমার ডান হাত যাদের মালিক হয়েছে তারা ছাড়া।” — কুরআন ৩৩:৫২
কাঠামোটা পড়ুন। আয়াতটি একটি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে: আর নতুন স্ত্রী নয়। কিন্তু নিষেধাজ্ঞাটির শেষে একটি অব্যাহতি: ইল্লা মা মালাকাত ইয়ামিনুক। অর্থাৎ সীমা পড়েছে বিবাহের ওপর, যৌন-প্রবেশাধিকারের ওপর নয়। স্ত্রীসংখ্যায় ছাদ আছে; দাসীসংখ্যায় নেই। এটি একই যুক্তিকাঠামোর পুনরাবৃত্তি, যা কুরআন ৪:৩-এ সাধারণ মুমিনদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, চারজন স্ত্রী, কিন্তু “অথবা তোমাদের ডান হাত যাদের মালিক হয়েছে” (সংখ্যাহীন)।
দুটো আয়াত একসাথে পড়লে একটি সুসংগত নীতি বেরিয়ে আসে: বিবাহ একটি চুক্তি, তাই তার শর্ত ও সীমা আছে; মালিকানা একটি অবস্থা, তাই তার সীমা নেই।
গনিমত বণ্টনে নবীর প্রাপ্তি ছিল দুই স্তরে,
ক) খুমস। “জেনে রাখো, তোমরা যা গনিমত লাভ করো তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহর, রাসুলের, নিকটাত্মীয়দের, ইয়াতিমদের…” (কুরআন ৮:৪১)। এবং গনিমতের মধ্যে বন্দি মানুষও অন্তর্ভুক্ত।
খ) সাফি (الصفي)। বণ্টনের আগে নবী নিজের পছন্দমতো একটি জিনিস বেছে নিতে পারতেন, একটি তলোয়ার, একটি ঘোড়া, বা একজন দাসী। সিরাত ও ফিকহি সাহিত্যে এটি নবীর খাসাইস (বিশেষাধিকার)-এর তালিকায় গণ্য। সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই এই বিভাগেরই উদাহরণ হিসেবে ধ্রুপদী গ্রন্থে আলোচিত।
মুহাম্মদের দাসীদের তালিকা
ধ্রুপদী সূত্রে নবীর মালিকানাধীন নারীদের তালিকা পাওয়া যায় ইবনে সাদের আত-তাবাকাতুল কুবরা (খণ্ড ১, পৃ. ৪৯৭ পার্শ্ববর্তী), ইবনুল কাইয়িমের যাদুল মাআদ (খণ্ড ১, “তাঁর দাস-দাসী” অধ্যায়), এবং আত-তাবারানির আল-মুজামুল কাবির-এ। তালিকায় আছেন: মারিয়া আল-কিবতিয়্যা, রায়হানা, সালমা উম্মে রাফি, মায়মুনা বিনতে সাদ, মায়মুনা বিনতে আবু আসিব, খাদরা, রাদওয়া, রাযিনা, উম্মে দামিরা, বারাকা (উম্মে আয়মান), এবং আরও কয়েকজন যাঁদের নাম বর্ণনাভেদে বদলায়। নিচে বিশেষ কয়েক জনের বর্ণনা দেয়া হল।
সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই (খায়বার, ৭ হিজরি):
বনু নাদির গোত্রের নেতা হুয়াই ইবনে আখতাবের কন্যা। তাঁর পিতা দুই বছর আগে বনু কুরায়যার পরিখায় শিরশ্ছেদ হয়েছেন। খায়বারে তাঁর স্বামী কিনানা ইবনে আর-রাবি নিহত হয়েছেন। ইবনে ইসহাকের বর্ণনায়, বনু নাদিরের গুপ্তধনের সন্ধানে কিনানার বুকে আগুন জ্বলিয়ে নির্যাতনের পর, শিরশ্ছেদ করা হয়। বিয়ের কয়েক দিনের মাথায় তিনি বিধবা এবং যুদ্ধবন্দি। বয়স অনুমান করা হয় ১৬–১৭।
সহিহ বুখারির বর্ণনাটি প্রক্রিয়াটিকে বিরলভাবে স্বচ্ছ করে তোলে:
দিহইয়া (আল-কালবি) বললেন, “হে আল্লাহর নবী! বন্দিদের মধ্য থেকে আমাকে একটি দাসী দিন।” নবী বললেন, “যাও, যে কোনো একটি দাসী নিয়ে নাও।” তিনি সাফিয়্যা বিনতে হুয়াইকে নিলেন। তখন এক ব্যক্তি নবীর কাছে এসে বলল, “হে আল্লাহর রাসুল! আপনি সাফিয়্যা বিনতে হুয়াইকে দিহইয়াকে দিয়েছেন, তিনি তো কুরায়যা ও নাদিরের নেত্রী, তিনি আপনি ছাড়া আর কারো উপযুক্ত নন।” নবী বললেন, “তাকে ডেকে আনো তার সাথে।” দিহইয়া তাঁকে নিয়ে এলে নবী তাঁকে দেখে দিহইয়াকে বললেন, “বন্দিদের মধ্য থেকে ইনি ছাড়া অন্য যে কোনো দাসী নিয়ে নাও।” সূত্র: সহিহ বুখারি ৩৭১, ২২২৮(সদৃশ), ৪২০০; সহিহ মুসলিম ১৩৬৫। তারপর নবী তাঁকে মুক্ত করেন এবং সেই মুক্তিদানকেই মোহর ধরে বিয়ে করেন (বুখারি ৫০৮৬, ৫১৬৯; মুসলিম ১৩৬৫)।
আনাস থেকে বর্ণিত: “নবী খায়বার ও মদিনার মাঝামাঝি এক জায়গায় তিন দিন অবস্থান করলেন এবং সেখানেই সাফিয়্যা বিনতে হুয়াইয়ের সাথে বাসর সম্পন্ন করলেন। আমি মুসলিমদের ওয়ালিমায় দাওয়াত দিলাম, যাতে গোশতও ছিল না, রুটিও না।” — সহিহ বুখারি ৫১৫৯; আরও ২২৩৫, ৪২১১, ৫১৬৯।
রায়হানা বিনতে যায়েদ (বনু কুরায়যা, ৫ হিজরি):
খন্দকের পর বনু কুরায়যার সব প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ মদিনার বাজারে খোঁড়া পরিখায় শিরশ্ছেদ হন। বন্দি নারীদের মধ্য থেকে নবী রায়হানাকে নিজের জন্য নেন।
“রাসুল কুরায়যার ইহুদি নারীদের মধ্য থেকে রায়হানা বিনতে আমরকে নিজের জন্য বেছে নিলেন। সে তাঁর দাসী হয়ে রইল। তাঁর ইন্তেকালের সময়ও সে তাঁর মালিকানায় ছিল।” — ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, খণ্ড ৮
ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় নবী তাঁকে বিয়ে ও পর্দার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি বলেন: “না, আমাকে আপনার মালিকানায় থাকতে দিন, সেটাই আমার ও আপনার জন্য সহজ।” ইবনে সাদের আরেক বর্ণনা: বন্দি হওয়ার পর তিনি ইসলাম গ্রহণে অনিচ্ছুক ছিলেন এবং ইহুদি ধর্মে অটল ছিলেন।
বনু মুস্তালিকের সরদার আল-হারিস ইবনে আবি দিরারের কন্যা। অভিযানে বন্দি হয়ে সাবিত ইবনে কায়স ইবনে শাম্মাসের ভাগে পড়েন।
আয়েশা: “…সে মুকাতাবার [মুক্তিচুক্তির] জন্য সাহায্য চাইতে রাসুলের কাছে এলো। আল্লাহর কসম, সে দরজায় দাঁড়ানোমাত্র আমি তাকে অপছন্দ করলাম, আমি বুঝলাম, আমি তার মধ্যে যা দেখছি রাসুলও তা দেখবেন।” নবী তাঁকে বললেন, “এর চেয়ে ভালো কিছু কি চাও? আমি তোমার মুক্তিপণ দিয়ে দিই এবং তোমাকে বিয়ে করি।” সে রাজি হলো। — সুনানে আবু দাউদ ৩৯৩১; মুসনাদে আহমাদ; ইবনে হিশাম। এরপর মুসলিমরা বনু মুস্তালিকের বাকি প্রায় একশো পরিবারের বন্দিদের মুক্ত করে দেন—”এরা তো এখন রাসুলের শ্বশুরকুল।”
মারিয়া আল-কিবতিয়্যা, (মিসরীয় উপহার, ৭ হিজরি):
মিসর ও আলেকজান্দ্রিয়ার শাসক আল-মুকাওকিস নবীর চিঠির জবাবে ইসলাম গ্রহণ করেননি, কিন্তু উপহার পাঠান, যার মধ্যে ছিলেন দুই বোন: মারিয়া ও সিরিন, একজন খোজা (মাবুর), একটি খচ্চর (দুলদুল), মধু ও বস্ত্র। দুটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম: মারিয়া ধ্রুপদী সীরাত-ঐতিহ্যে সুররিয়া (দাসী/উপপত্নী) হিসেবেই বর্ণিত, উম্মাহাতুল মুমিনিনের (নবীর স্ত্রীদের) তালিকায় তিনি সাধারণত থাকেন না। ইবনে সাদ, ইবনুল কাইয়িম ও অধিকাংশ সীরাতকার তাঁকে দাসীদের অধ্যায়ে রাখেন। কিছু পরবর্তী আলিম (যেমন ইবনে কাসিরের কিছু বর্ণনায়) বলেন তিনি মুক্ত ও বিবাহিত হয়েছিলেন; এটি সংখ্যালঘু মত। তাঁর গর্ভে ইব্রাহিম জন্মান (৮ হিজরি), যিনি শৈশবেই মারা যান। সন্তান জন্মের পর তিনি উম্মে ওয়ালাদ মর্যাদা পান।
দ্বিতীয়, এবং এটি এবিষয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ, মারিয়ার বোন সিরিনকে মুহাম্মদ হাসসান ইবনে সাবিতকে দিয়ে দেন। তাঁদের পুত্র আবদুর রহমান ইবনে হাসসান। এই দ্বিতীয় তথ্যটির তাৎপর্য প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হয়। একজন মানুষকে উপহার হিসেবে পাওয়া হয়েছে, এবং উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছে। এটি ব্যতিক্রমী কিছু নয়, এবং সূত্রগুলো এটি কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, কারণ ওই কাঠামোয় এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক লেনদেন ছিল।
মুহাম্মদের পুরুষ দাস ও মাওয়ালি
দাসীদের নিয়ে আলোচনা বেশি হয়, কিন্তু সংখ্যায় পুরুষ দাস কম ছিল না। ইবনুল কাইয়িম যাদুল মাআদ-এ (খণ্ড ১) নবীর মালিকানাধীন পুরুষদের একটি দীর্ঘ তালিকা দিয়েছেন, সংকলন ও সংস্করণভেদে ৩০ থেকে ৪০ জনের নাম পওয়া যায়।
তালিকা থেকে (নাম ও উৎস বর্ণনাভেদে সামান্য বদলায়): যায়েদ ইবনে হারিসা, আবু রাফি (আসলাম), সাওবান, শুকরান (সালিহ), রাবাহ, ইয়াসার আন-নুবি, সাফিনা (মিহরান/মাবুর নামান্তরে), আবু কাবশা (সুলাইমান), মিদআম, কারকারা, আনজাশা আল-হাদি, ফাদালা, ওয়াকিদ, আবু ওয়াকিদ, হুনাইন, সানদার, আফলাহ, উবাইদ, যাকওয়ান, আবু মুওয়াইহিবা, আবু উসাইব, কাসসাম, তাহমান, মারওয়ান, মাবুর আল-কিবতি, এবং আরও অনেকে।
কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা:
যায়েদ ইবনে হারিসা। কালব গোত্রের অপহৃত বালক, মক্কার বাজারে বিক্রি, খাদিজার মাধ্যমে নবীর মালিকানায়। মুক্তি ও দত্তক গ্রহণ; পরে কুরআন ৩৩:৪–৫ দ্বারা দত্তক-সম্পর্ক বাতিল হলে তিনি আবার “যায়েদ ইবনে হারিসা” হন। তিনি কুরআনে নাম-উল্লেখিত একমাত্র সাহাবি (৩৩:৩৭)। নবী মুহাম্মদ পরবর্তী সময়ে এই দত্তক পুত্র যায়েদের স্ত্রী জয়নব বিনতে জাহশকে বিবাহ করেন।
সাফিনা। উম্মে সালামার দাস। তিনি তাঁকে মুক্ত করেন এই শর্তে যে তিনি আজীবন নবীর সেবা করবেন। শর্তসাপেক্ষ মুক্তির এই রূপটি লক্ষণীয়: মুক্তি এবং আজীবন সেবা-বাধ্যবাধকতা পরস্পরবিরোধী নয়। আবু রাফি (আসলাম), নবীর চাচা আব্বাসের দাস, যাঁকে আব্বাস নবীকে উপহার দেন; পরে মুক্ত হন। তাঁকে বিয়ে দেওয়া হয় সালমা উম্মে রাফির সাথে, যিনি নিজেও নবীর দাসী ছিলেন। অর্থাৎ মালিক দুই দাসের মধ্যে বিবাহের ব্যবস্থা করছেন, যা ফিকহে মালিকের স্বীকৃত অধিকার।
ইয়াসার আন-নুবি। নুবীয় দাস, নবীর উটের রাখাল; উরাইনা গোত্রের একদল লোক তাঁকে হত্যা করে উট নিয়ে পালায়। এই ঘটনার প্রতিশোধে যে শাস্তি দেওয়া হয়, তা সহিহ বুখারি ২৩৩, ৩০১৮, ৪১৯২ ও সহিহ মুসলিম ১৬৭১-এ বর্ণিত, হাত-পা কেটে, চোখে গরম শলাকা দিয়ে, মরুভূমিতে পিপাসায় মরতে দেওয়া। (এটি স্বতন্ত্র আলোচনার বিষয়, তবে ঘটনাটির সূচনাবিন্দু একজন দাসের হত্যা।)
মিদআম ও কারকারা। দুজনেই নবীকে উপহার দেওয়া দাস। মিদআম খায়বারে তীরবিদ্ধ হয়ে নিহত হন; ঘটনাটি বুখারি ৪২৩৪ ও মুসলিম ১১৫-এ আছে, যেখানে নবী বলেন গনিমত থেকে চুরি করা একটি চাদরের কারণে সে জাহান্নামে যাবে।
মুহাম্মদের দাস কেনা, বেচা, দেওয়া ও বণ্টন
মালিকানার প্রশ্নে সবচেয়ে নির্ণায়ক প্রমাণ হলো লেনদেন। কারণ যা কেনা-বেচা-উপহার দেওয়া যায়, তা আইনত সম্পত্তি।
ক) বিক্রয়: জাবির (রা.): এক ব্যক্তি তার দাসকে মৃত্যুর পর মুক্ত করার ঘোষণা (মুদাব্বার) দিয়েছিল; পরে অর্থসংকটে পড়লে নবী দাসটিকে নিয়ে বললেন, “কে এই দাসটি আমার কাছ থেকে কিনবে?” নুআইম ইবনে আবদুল্লাহ অমুক অমুক দামে কিনলেন, এবং নবী তাকে দাসটি দিয়ে দিলেন। — সহিহ বুখারি ২১৪১, ২২৩০; সহিহ মুসলিম ৯৯৭
খ) বিনিময়: জাবির (রা.): এক দাস এসে হিজরতের বাইআত করল; নবী জানতেন না সে দাস। তার মালিক এসে তাকে ফেরত চাইলে নবী বললেন, “তাকে আমার কাছে বিক্রি করো”, এবং দুটি কালো দাসের বিনিময়ে তাকে কিনলেন। এরপর থেকে তিনি বাইআত নেওয়ার আগে জিজ্ঞেস করতেন, “সে কি দাস?” সহিহ মুসলিম ১৬০২; জামে তিরমিযি ১২৩৯ (হাসান সহিহ); সুনানে নাসাঈ ৪১৮৯; সুনানে ইবনে মাজাহ ২৮৯৬; সুনানে আবু দাউদ ৩৩৫৮।
এই হাদিসটি দুটো কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এক, বিনিময়ের হার স্পষ্ট: এক দাস = দুই দাস। ইমাম তিরমিযি নিজেই টীকায় বলেছেন, এই হাদিস থেকে আলিমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে নগদ লেনদেনে এক দাসের বিনিময়ে দুই দাস কেনা জায়েজ। দুই, “মালিকের অনুমতি ছাড়া দাস হিজরত করতে পারে না” এই নীতিটাও এখান থেকে প্রতিষ্ঠিত।
গ) উপহার: সিরিনকে হাসসান ইবনে সাবিতকে দেওয়া (উপরে আলোচিত)। এছাড়া সীরাতে বহু ঘটনা, নবী বিভিন্ন সাহাবিকে দাস ও দাসী দিয়েছেন, এবং নিজেও উপহার হিসেবে দাস পেয়েছেন (আব্বাস থেকে আবু রাফি, আবদুর রহমান ইবনে আউফ থেকে শুকরান, হাওদা ইবনে আলি থেকে কারকারা, মুকাওকিস থেকে মারিয়া-সিরিন-মাবুর)।
ঘ) বণ্টন: খুমস থেকে দাসী বণ্টনের একটি ঘটনা সহিহ বুখারিতে সরাসরি লিপিবদ্ধ: বুরাইদা (রা.): নবী আলিকে খালিদের কাছে পাঠালেন খুমস আনার জন্য। আলি [খুমসের একটি দাসীর সাথে সহবাসের পর] গোসল করেছিলেন। আমি আলিকে অপছন্দ করতাম, তাই খালিদকে বললাম, “দেখছ না এ কী করছে?” আমরা নবীর কাছে ফিরে এলে আমি বিষয়টা তাঁকে বললাম। তিনি বললেন, “হে বুরাইদা! তুমি কি আলিকে অপছন্দ করো?” আমি বললাম, “হ্যাঁ।” তিনি বললেন, “তাকে অপছন্দ কোরো না, কারণ খুমসে তার প্রাপ্য এর চেয়েও বেশি।” — সহিহ বুখারি ৪৩৫০
এই একটি বর্ণনায় পুরো ব্যবস্থাটা দৃশ্যমান: যুদ্ধ → বন্দি → খুমস → দাসী → যৌনসংগম → এবং নবীর অনুমোদন। বুরাইদার আপত্তি ছিল “আলি বেশি নিয়েছে” জাতীয় প্রাপ্যসংক্রান্ত; নবীর জবাবও প্রাপ্যসংক্রান্ত। যে প্রশ্নটি কারো মনেই ওঠেনি, তা হলো নারীটির সম্মতি।
দাসপ্রথা সম্পর্কে ফিকহের (ইসলামী আইন শাস্ত্র) কাঠামো
কুরআন ও হাদিসের ভিত্তিতে ধ্রুপদী ফিকহ যে কাঠামো গড়েছে, তা যান্ত্রিকভাবে সুসংগত। এখানে মূল বিধানগুলো:
সম্পত্তি হিসেবে ক্রয়-বিক্রয়: দাস বিক্রয়যোগ্য পণ্য। নবী নিজে দাস ক্রয়-বিক্রয় করেছেন। জাবির (রা.) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি তার দাসকে মৃত্যুর পর মুক্ত করার ঘোষণা (মুদাব্বার) দিয়েছিল, পরে অর্থসংকটে পড়লে নবী দাসটিকে নিয়ে বলেন, “কে এই দাসটি আমার কাছ থেকে কিনবে?” নুআইম ইবনে আবদুল্লাহ কিনে নেন (সহিহ বুখারি ২১৪১, ২২৩০; সহিহ মুসলিম ৯৯৭)। আরেক বর্ণনায় বলা হয়, এক দাস হিজরতের বাইআত করলে তার মালিক এসে তাকে ফেরত চায়। নবী বলেন “তাকে আমার কাছে বিক্রি করো”, এবং দুটি কালো দাসের বিনিময়ে তাকে কেনেন (সহিহ মুসলিম ১৬০২; জামে তিরমিযি ১২৩৯; সুনানে নাসাঈ ৪১৮৯; সুনানে ইবনে মাজাহ ২৮৯৬; সুনানে আবু দাউদ ৩৩৫৮)।
উত্তরাধিকার, দান, বন্ধক, ভাড়া: সবই বৈধ। ফিকহের কিতাবে দাস-সংক্রান্ত বিধান কিতাবুল বুয়ু (ক্রয়-বিক্রয়) ও কিতাবুল ইতক (মুক্তিদান) অধ্যায়ে আলোচিত, অর্থাৎ সম্পত্তি আইনের ভেতরে। দাসের নিজের কোনো সম্পত্তি নেই। কুরআন ১৬:৭৫ এই অক্ষমতাকেই বর্ণনা করে এবং দাসকে মূল্যহীন হিসেবে প্রকাশ করে।:
আল্লাহ উপমা পেশ করেছেন; একজন অধিনস্ত দাস যে কোন কিছুর উপর ক্ষমতা রাখে না। আর একজন যাকে আমি আমার পক্ষ থেকে উত্তম রিযক দিয়েছি, অতঃপর সে তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে। তারা কি সমান হতে পারে? সমস্ত প্রশংসা আল্লা্হর। বরং তাদের অধিকাংশই জানে না। — কুরআন ১৬:৭৫
আইনি ব্যক্তিত্বে অসমতা, শাস্তি অর্ধেক: “যদি তারা [দাসী] বিবাহিত হওয়ার পর ব্যভিচার করে, তবে তাদের শাস্তি হবে স্বাধীন নারীদের শাস্তির অর্ধেক।” (কুরআন ৪:২৫) — অর্থাৎ ৫০ বেত্রাঘাত। রজম (প্রস্তরাঘাত) দাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, কারণ অর্ধেক করা যায় না।
কিসাস: “স্বাধীনের বদলে স্বাধীন, দাসের বদলে দাস, নারীর বদলে নারী।” (কুরআন ২:১৭৮) হানাফিরা কিছু ক্ষেত্রে সমতা স্বীকার করলেও মালিকি, শাফিয়ি ও হাম্বলি মূলধারার অবস্থান: স্বাধীন ব্যক্তিকে কোনো দাস হত্যার দায়ে কিসাসে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় না।
দিয়াত (রক্তপণ): দাসের ক্ষতিপূরণ তার বাজারমূল্য, মানুষের রক্তপণ নয়, ক্ষতিগ্রস্ত সম্পত্তির মূল্য। সাক্ষ্য: অধিকাংশ মাযহাবে দাসের সাক্ষ্য অগ্রহণযোগ্য বা সীমিত। বিবাহ: দাস মালিকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করতে পারে না। মালিক দাস-দম্পতিকে আলাদা করে বিক্রি করতে পারে (যদিও কিছু ফকিহ এটাকে মাকরুহ বলেছেন)।
দাসীর সঙ্গে যৌন মিলন: সম্মতির প্রয়োজন নেই। চারটি সুন্নি মাযহাবের কোথাও দাসীর সাথে যৌনসংগমের জন্য তার সম্মতি শর্ত নয়। মালিকানাই যথেষ্ট। বিবাহচুক্তি (নিকাহ), সাক্ষী, মোহর, অভিভাবক, কিছুই লাগে না। ইবনে কুদামা আল-মুগনি-তে যে শর্তগুলো আলোচনা করেছেন সেগুলো পিতৃত্ব-নিশ্চয়তা ও যৌথ-মালিকানা সংক্রান্ত; সম্মতি সেখানে নেই।
দাসদাসী রাখার সংখ্যায় সীমা নেই। সামর্থ্য অনুযায়ী যত ইচ্ছা রাখা যায়। ইস্তিবরা: নতুন দাসীর সাথে সহবাসের আগে এক হায়েজ অপেক্ষা (গর্ভবতী হলে সন্তান জন্ম পর্যন্ত)। উম্মে ওয়ালাদ: যে দাসী মালিকের সন্তান জন্ম দেয়, সে বিক্রয়-অযোগ্য হয়ে যায় এবং মালিকের মৃত্যুতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুক্ত হয়। সন্তান স্বাধীন ও বৈধ। এটি কুরআনের বিধান নয়; এটি খলিফা উমরের ইজতিহাদ। নবীর জীবদ্দশায় উম্মে ওয়ালাদ বিক্রি হতো। আলি (রা.) খিলাফতের শেষদিকে উমরের এই সিদ্ধান্ত বাতিল করে পুনরায় বিক্রয় বৈধ ঘোষণা করেন, এই মতই শিয়া ফিকহে গৃহীত। সুন্নি চার মাযহাব উমরের অবস্থান নিয়েছে।
উম্মে ওয়ালাদের বিধান, যেটাকে প্রায়ই ইসলামের মানবিকতার প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হয়, সেটা আসলে একজন মানুষের, উমরের সংস্কার, আল্লাহর বিধান নয়।
পাঠকদের প্রতি প্রশ্ন
আমরা সভ্য সমাজ বলতে যা বুঝি, সেই সমাজে ইসলামের এই কিয়ামতপর্যন্ত কার্যকর বিধান কি গ্রহণযোগ্য?
কমেন্টে আপনার মতামত জানাতে পারেন অথবা ইমেল করতে পারেন zt.abir@gmail.com
“নাস্তিক” শব্দটা নিয়ে যত তর্ক হয়, তার সিংহভাগই আসলে সংজ্ঞা নিয়ে গোলমাল। একজন বলেন, নাস্তিক মানে যে জোর গলায় ঘোষণা করে “ঈশ্বর বলে কিছু নেই”। আরেকজন বলেন, নাস্তিক মানে যে শুধু ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না। দুটো কিন্তু এক জিনিস নয়। একটা হলো নির্দিষ্ট দাবি করা, আর অন্যটা হলো একটা দাবি মেনে না নেওয়া। এই দুইয়ের ফারাক না বুঝলে গোটা আলোচনাটাই ভুল পথে চলে যায়। তাই কে ঠিক আর কে ভুল, সেই তর্কে ঢোকার আগে পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার, আমরা ঠিক কোন জিনিসটার কথা বলছি।
এই লেখার উদ্দেশ্য নাস্তিকতা প্রমাণ করা নয়, আস্তিকতা খণ্ডন করাও নয়। উদ্দেশ্য শুধু একটাই, শব্দটা আসলে কী বোঝায়, তার ভেতরে কয় রকমের অবস্থান আছে, কোন প্রশ্নের সঙ্গে এর সম্পর্ক আর কোন প্রশ্নের সঙ্গে নেই, সেটা গুছিয়ে বলা। একটা অবস্থান সত্য কি মিথ্যা, সেই বিচারে যাওয়ার আগে অবস্থানটা কী সেটা এটুকু স্পষ্ট করা জরুরি।
শব্দটা কোথা থেকে এলো
“নাস্তিক” শব্দটার বাংলা উৎস সংস্কৃত — “ন অস্তি” অর্থাৎ “নেই”, তার থেকে “নাস্তি”, আর যে “নাস্তি” বলে সে “নাস্তিক”। মজার ব্যাপার হলো, ইংরেজি “atheism” শব্দটার গঠনও প্রায় হুবহু একই যুক্তিতে দাঁড়িয়ে। এটি এসেছে গ্রিক শব্দ átheos (ἄθεος) থেকে, যেখানে a- মানে “ছাড়া / বিহীন” আর theos (θεός) মানে “দেবতা” বা “ঈশ্বর”। অর্থাৎ আক্ষরিক অর্থে “ঈশ্বরবিহীন”। খেয়াল করার মতো ব্যাপার, এই উপসর্গ a- মানে কিন্তু “বিরুদ্ধে” নয়; “বিরুদ্ধে” বোঝাতে গ্রিকে আলাদা উপসর্গ ছিল anti-। তাই শব্দটার গোড়াতেই কোনো আক্রমণাত্মক ভাব নেই; আছে শুধু অনুপস্থিতির ইঙ্গিত, বিশ্বাসের অনুপস্থিতি।
প্রাচীন গ্রিসে átheos শব্দটা প্রথমে ছিল একটা গালি, যাকে “অধার্মিক” বা “দেবতাদের অস্বীকারকারী” বলে দোষ দেওয়া হতো, তাকেই এই নামে ডাকা হতো। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে এসে এর মানে খানিকটা সক্রিয় হয় “দেবতাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নকারী” এই অর্থে। ইংরেজিতে “atheism” শব্দটা ঢোকে ষোড়শ শতকে, ফরাসি athéisme হয়ে; অভিধান-ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী এর প্রথম ইংরেজি ব্যবহার ১৫৮৭ সালের কাছাকাছি। তবে একটা কথা মনে রাখা দরকার, অষ্টাদশ শতকের আগে পর্যন্ত কেউ নিজেকে গর্ব করে “নাস্তিক” বলত না; শব্দটা ছিল বিশুদ্ধ অপবাদ, অন্যের গায়ে সাঁটানোর তকমা। নিজের পরিচয় হিসেবে “নাস্তিক” শব্দটা মানুষ গ্রহণ করতে শুরু করে অনেক পরে।
তার মানে অবশ্য এই নয় যে নাস্তিক্য-ধরনের চিন্তা আধুনিক আবিষ্কার। শব্দটা নতুন হলেও চিন্তাটা অতি প্রাচীন। ভারতেই ছিল চার্বাক বা লোকায়ত দর্শন, যারা বেদের প্রামাণ্যতা, পরলোক আর অদৃশ্য সত্তা অস্বীকার করে শুধু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎকেই বাস্তব বলে মানত। গ্রিসে ডেমোক্রিটাস আর এপিকিউরাসের বস্তুবাদী চিন্তা, কিংবা মেলোসের ডায়াগোরাস এঁরা সবাই ঈশ্বরকেন্দ্রিক ব্যাখ্যা ছাড়াই জগৎকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। অর্থাৎ “ঈশ্বর ছাড়া জগৎ ব্যাখ্যা করা যায় কি না” এই প্রশ্নটা মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে করে আসছে।
মূল সংজ্ঞা:
“নাস্তিকতা” শব্দটার দুটো আলাদা ব্যবহার আছে, আর বেশিরভাগ তর্ক বাধে এই দুটোকে গুলিয়ে ফেলার কারণে। দার্শনিকরা একে বলেন শব্দটির “বহুরূপতা” (polysemy)।
প্রথম অর্থ — মনস্তাত্ত্বিক অর্থে: এখানে নাস্তিকতা হলো একটা মানসিক অবস্থা, নির্দিষ্ট করে বললে “ঈশ্বরে বিশ্বাসের অনুপস্থিতি”। আস্তিক মানে যে বিশ্বাস করে ঈশ্বর আছে; আর নাস্তিক মানে সহজভাবে, যে আস্তিক নয়। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী নাস্তিক কোনো দাবি করছে না, সে শুধু আস্তিকের দাবিটা গ্রহণ করছে না।
দ্বিতীয় অর্থ — দার্শনিক বা প্রস্তাবনামূলক অর্থে: দর্শনের প্রথাগত ব্যবহারে “নাস্তিকতা” একটা মানসিক অবস্থা নয়, বরং একটা প্রস্তাবনা বা দাবি — “ঈশ্বর নেই”। এই অর্থে নাস্তিক সেই ব্যক্তি, যে সক্রিয়ভাবে মনে করে ঈশ্বরের অস্তিত্ব মিথ্যা। দার্শনিক উইলিয়াম রো-র ভাষায়, নাস্তিকতা হলো “সেই অবস্থান যা ঈশ্বরের অনস্তিত্ব দাবি করে; এটি নিছক বিশ্বাস স্থগিত রাখা নয়, বরং সক্রিয় অবিশ্বাস।” Cambridge Dictionary of Philosophy-ও জানাচ্ছে, দর্শনে এই কঠোর অর্থটাই মানসম্মত (standard) — যেখানে নাস্তিকতা মানে “কোনো ঈশ্বর নেই এই বিশ্বাস।”
তাহলে দাঁড়াল দুটো ছবি। একদিকে “বিশ্বাস করি না” (অনুপস্থিতি), অন্যদিকে “বিশ্বাস করি যে নেই” (দাবি)। এই ফারাকটা তুচ্ছ নয়, বরং গোটা বিতর্কের কেন্দ্র। কারণ কে কোন দাবির জন্য প্রমাণ দিতে বাধ্য, সেটা নির্ভর করে ঠিক কোন অর্থে “নাস্তিক” শব্দটা ব্যবহার হচ্ছে তার উপর।
নাস্তিকতার প্রকারভেদ
উপরের দুই অর্থকে দার্শনিকরা আরও গুছিয়ে দুই জোড়া শ্রেণিতে ভাগ করেন। জোড়া দুটো আলাদা, কিন্তু পরস্পর সম্পর্কিত।
এক · দুর্বল বনাম শক্তিশালী (নেতিবাচক বনাম ইতিবাচক)
এই ভাগটা এসেছে অ্যান্টনি ফ্লু, মাইকেল মার্টিন প্রমুখ দার্শনিকদের হাত ধরে।
দুর্বল বা নেতিবাচক নাস্তিকতা মানে শুধু ঈশ্বরে বিশ্বাসের অভাব — “আমার কাছে ঈশ্বরের অস্তিত্বের যথেষ্ট প্রমাণ নেই, তাই আমি বিশ্বাস করি না।” এখানে “ঈশ্বর নেই” — এমন কোনো দাবি করা হচ্ছে না।
শক্তিশালী বা ইতিবাচক নাস্তিকতা মানে সরাসরি দাবি করা — “ঈশ্বর নেই।” এটা শুধু বিশ্বাসের অভাব নয়, বরং একটা নির্দিষ্ট অবস্থান, যার পক্ষে যুক্তি-প্রমাণ দেওয়া যায় এবং দেওয়া দরকারও।
দুই · প্রচ্ছন্ন বনাম প্রকাশ্য
এই ভাগটা করেছেন জর্জ এইচ. স্মিথ, তাঁর Atheism: The Case Against God (১৯৭৯) বইয়ে। স্মিথের সংজ্ঞায়:
প্রচ্ছন্ন নাস্তিকতা — “সচেতনভাবে অস্বীকার না করেই ঈশ্বরবিশ্বাসের অনুপস্থিতি।” যে ঈশ্বরের ধারণার সঙ্গেই পরিচিত নয়, সে এই অর্থে নাস্তিক। যেমন সদ্যোজাত শিশু, কিংবা যে সমাজে ঈশ্বরের ধারণাই পৌঁছায়নি সেখানকার মানুষ। অস্বীকার করতে হলে আগে জানতে হয় কী অস্বীকার করছি, সেই জ্ঞানটাই যার নেই, সে কিছু অস্বীকারও করছে না, শুধু বিশ্বাসও করছে না।
প্রকাশ্য নাস্তিকতা — “সচেতন প্রত্যাখ্যানের ফলে ঈশ্বরবিশ্বাসের অনুপস্থিতি।” অর্থাৎ যে ব্যক্তি ঈশ্বরের ধারণা বুঝেছে, ভেবেছে, এবং শেষে বিশ্বাস না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
স্মিথের মূল কথাটা তাৎপর্যপূর্ণ — নাস্তিক, সে প্রচ্ছন্ন হোক বা প্রকাশ্য, “কোনো কিছুর অস্তিত্ব দাবি করে না; সে কোনো ইতিবাচক বিবৃতি দেয় না।” নাস্তিকতার কেন্দ্রে আছে শুধু একটাই জিনিস, ঈশ্বরবিশ্বাসের অনুপস্থিতি। কেন সেই বিশ্বাস অনুপস্থিত (না জানার কারণে, নাকি ভেবেচিন্তে প্রত্যাখ্যানের কারণে) শুধু সেটুকুই বিভিন্ন নাস্তিক অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়।
নাস্তিকতা বনাম অজ্ঞেয়বাদ
এখানে একটা বহুল-প্রচলিত ভুল বোঝাবুঝি পরিষ্কার করা দরকার। অনেকেই ভাবেন, আস্তিকতা আর নাস্তিকতার মাঝখানে একটা নিরাপদ তৃতীয় অবস্থান হলো অজ্ঞেয়বাদ (agnosticism) — যার অর্থ “আমি জানি না।” কিন্তু ব্যাপারটা আসলে এত সরল নয়, কারণ নাস্তিকতা আর অজ্ঞেয়বাদ দুটো ভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেয়।
শব্দটা তৈরি করেছিলেন জীববিজ্ঞানী টি. এইচ. হাক্সলি, ১৮৬৯ সালে। তাঁর কাছে অজ্ঞেয়বাদী সেই ব্যক্তি, যে “ঈশ্বর আছেন” এই প্রস্তাবনা বিবেচনা করেছে, কিন্তু একে সত্যও বলে না, মিথ্যাও বলে না। মূল কথাটা হলো —
নাস্তিকতা/আস্তিকতা — এটা বিশ্বাস সম্পর্কিত প্রশ্ন: তুমি কি ঈশ্বরে বিশ্বাস করো?
অজ্ঞেয়বাদ/জ্ঞেয়বাদ — এটা জ্ঞান সম্পর্কিত প্রশ্ন: তুমি কি জানো (নিশ্চিতভাবে) ঈশ্বর আছেন কি নেই?
এই দুটো ভিন্ন অক্ষ হওয়ায় এদের মিশিয়ে চার রকম অবস্থান দাঁড়ায়। কেউ হতে পারে “অজ্ঞেয়বাদী নাস্তিক” — “আমি নিশ্চিত করে জানি না ঈশ্বর আছেন কি না, তবে যথেষ্ট প্রমাণ পাইনি বলে বিশ্বাস করি না।” আবার কেউ হতে পারে “অজ্ঞেয়বাদী আস্তিক” — “নিশ্চিত করে জানি না, তবু বিশ্বাস করি।” তাই “আমি জানি না” বলাটা নাস্তিকতা থেকে বেরিয়ে যাওয়া নয়; বরং অধিকাংশ চিন্তাশীল নাস্তিক এই অর্থে অজ্ঞেয়বাদীই, তাঁরা পরম নিশ্চয়তার দাবি করেন না, শুধু বলেন প্রমাণের অভাবে বিশ্বাসটা তাঁরা ধরে রাখতে পারছেন না।
এর পাশাপাশি আরও দুটো শব্দ চলে আসে। ধর্মবিরোধিতা (antitheism) — শুধু অবিশ্বাস নয়, বরং সক্রিয়ভাবে ধর্ম বা ঈশ্বরবিশ্বাসকে ক্ষতিকর মনে করা; এটা নাস্তিকতার একটা বিশেষ, বাড়তি অবস্থান, সব নাস্তিকের ক্ষেত্রে খাটে না। আর উদাসীনতাবাদ (apatheism) — প্রশ্নটা সত্য না মিথ্যা, তা নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজনই বোধ না করা।
প্রমাণের দায় কার?
এবার আসি সবচেয়ে বিতর্কিত প্রশ্নে — কে প্রমাণ দিতে বাধ্য? অ্যান্টনি ফ্লু তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ The Presumption of Atheism (১৯৭৬)-এ যুক্তি দিয়েছিলেন, ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে যেকোনো আলোচনা শুরু হওয়া উচিত অবিশ্বাসকে “ডিফল্ট” বা প্রারম্ভিক অবস্থান ধরে নিয়ে, ঠিক যেভাবে আদালতে অভিযুক্তকে দোষী প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ ধরে নেওয়া হয়। এখানে যুক্তিটা হলো: যে ব্যক্তি একটা ইতিবাচক দাবি করছে (“ঈশ্বর আছেন”), প্রমাণের দায় তার; যে শুধু দাবিটা গ্রহণ করছে না, তার উপর প্রমাণের কোনো দায় বর্তায় না।
এই ধারণাটা বোঝাতে বার্ট্রান্ড রাসেল একটা বিখ্যাত উপমা দিয়েছিলেন, মহাকাশে একটা কল্পিত চায়ের কেটলি। যদি আমি দাবি করি, পৃথিবী আর মঙ্গলের মাঝখানে একটা ছোট্ট চিনামাটির কেটলি সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে, আর সেটা এত ছোট যে কোনো টেলিস্কোপে ধরা পড়ে না — তাহলে “প্রমাণ করে দেখাও কেটলিটা নেই” বলে আমি অন্যদের ঘাড়ে দায় চাপাতে পারি না। দায়টা আমারই, যে অস্বাভাবিক দাবিটা করছি। রাসেলের মূল কথা: যে দাবি করে, প্রমাণের ভার তার, অনুপস্থিতি প্রমাণ করা অস্বীকারকারীর কাজ নয়।
তবে এখানে একটা সূক্ষ্ম কিন্তু জরুরি কথা আছে, যেটা সৎভাবে স্বীকার করা দরকার — এই “প্রমাণের দায় প্রতিপক্ষের” যুক্তি কেবল দুর্বল/নেতিবাচক নাস্তিকতার ক্ষেত্রে খাটে। যে ব্যক্তি শক্তিশালী নাস্তিক, অর্থাৎ সরাসরি দাবি করে “ঈশ্বর নেই”, তার উপরও কিন্তু প্রমাণের দায় বর্তায়, কারণ সেও একটা ইতিবাচক দাবি করছে। “আমি শুধু বিশ্বাস করি না” আর “আমি দাবি করি নেই” এই দুইয়ের সুবিধা একসঙ্গে ভোগ করা যায় না। এই সততাটুকু নাস্তিক পক্ষেরও রক্ষা করা উচিত।
কয়েকটি প্রচলিত ভুল ধারণা
নাস্তিকতা নিয়ে কিছু ভুল ধারণা এত গভীরভাবে গেঁথে আছে যে সেগুলো আলাদা করে ভাঙা দরকার।
এক — নাস্তিকতা মানে “নিশ্চিতভাবে জানি ঈশ্বর নেই” নয়। আগেই বলা হয়েছে, বেশিরভাগ নাস্তিক পরম নিশ্চয়তার দাবি করেন না। তাঁরা প্রমাণের অভাবে বিশ্বাস স্থগিত রাখেন, এটা দম্ভ নয়, বরং প্রমাণের প্রতি এক ধরনের সততা।
দুই — নাস্তিকতা কোনো ধর্ম নয়। কেউ কেউ বলেন, “নাস্তিকতাও তো একটা বিশ্বাস।” কিন্তু বিশ্বাস না করা-কে বিশ্বাস বলা আর টাক-কে চুলের রং বলার মধ্যে ফারাক নেই। নাস্তিকতা কোনো ধর্মগ্রন্থ, উপাসনা, নৈতিক বিধান বা প্রতিষ্ঠান নিয়ে আসে না, এটা একটামাত্র প্রশ্নের একটামাত্র উত্তর।
তিন — নাস্তিকতা মানে একটা পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন নয়। নাস্তিকতা শুধু “ঈশ্বরে বিশ্বাস করো কি না” — এই একটি প্রশ্নেরই উত্তর। এটা নীতিশাস্ত্র, রাজনীতি বা জীবনের অর্থ নিয়ে কিছু বলে না। একজন নাস্তিক হতে পারেন মানবতাবাদী, আবার আরেকজন হতে পারেন সম্পূর্ণ ভিন্ন মতের। বস্তুবাদ, ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদ, সংশয়বাদ — এসব নাস্তিকতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু নাস্তিকতার অংশ নয়।
চার — নাস্তিকতা মানে অনৈতিকতা বা “শয়তানপূজা” নয়। শয়তানে বিশ্বাস করতে হলে আগে অতিপ্রাকৃত সত্তায় বিশ্বাস করতে হয়, যা নাস্তিক করে না। আর নৈতিকতা? মানুষ ধর্মের বহু আগে থেকেই সমাজবদ্ধ, সহযোগিতাপ্রবণ প্রাণী; নীতিবোধের উৎস নিয়ে দার্শনিক তর্ক থাকলেও, “ঈশ্বরে বিশ্বাস না করলে নীতিবোধ থাকে না” এমন কোনো যুক্তিসিদ্ধ ভিত্তি নেই।
বিপক্ষের সবচেয়ে জোরালো আপত্তিটা কী
সততার খাতিরে এবার উল্টো দিকের সবচেয়ে শক্তিশালী আপত্তিটা তুলে ধরা দরকার, কারণ সেটা একেবারে ফেলনা নয়। দার্শনিক উইলিয়াম লেন ক্রেইগ-সহ অনেক আস্তিক চিন্তক যুক্তি দেন নাস্তিকতাকে নিছক “বিশ্বাসের অভাব” হিসেবে সংজ্ঞায়িত করাটা আসলে একটা কৌশল, প্রমাণের দায় এড়ানোর পথ। তাঁদের বক্তব্য: যদি নাস্তিকতা মানে শুধুই বিশ্বাসের অনুপস্থিতি হয়, তাহলে তো পাথর, গাছ, সদ্যোজাত শিশু, এরাও “নাস্তিক”, কারণ এদের কারোরই ঈশ্বরবিশ্বাস নেই। এভাবে সংজ্ঞাটা এত প্রশস্ত হয়ে পড়ে যে শব্দটা প্রায় অর্থহীন হয়ে যায়। তাঁদের মতে, “নাস্তিকতা” শব্দটার একটা দার্শনিক অবস্থান বোঝানো উচিত, “ঈশ্বর নেই” যার পক্ষে যুক্তি দিতে হবে, ঠিক যেমন আস্তিককে তার অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিতে হয়।
এই আপত্তির একটা সত্যিকারের জোর আছে, আর তা অস্বীকার করা অসততা হবে। প্রকৃতপক্ষে দর্শনের প্রথাগত ব্যবহারে “নাস্তিকতা” মানে ঐ প্রস্তাবনামূলক দাবিটাই, এবং সেই কারণেই এটা যুক্তি দিয়ে যাচাই করা সম্ভব। একটা মানসিক অবস্থাকে যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করা যায় না, কিন্তু একটা দাবিকে যায়। তাই ন্যায্য কথাটা হয়তো এই, নাস্তিক পক্ষের নিজেরই স্পষ্ট থাকা দরকার, সে কোন অর্থে “নাস্তিক” বলছে। যদি সে শুধু বিশ্বাস স্থগিত রাখে, তবে সেটা এক জিনিস; আর যদি সে “ঈশ্বর নেই” দাবি করে, তবে সেই দাবির পক্ষে যুক্তি হাজির করার দায়িত্বও তারই। দুই নৌকায় পা রেখে সুবিধাজনক সময়ে সুবিধাজনক সংজ্ঞায় সরে যাওয়াটা বৌদ্ধিক সততার পরিপন্থী, এই সমালোচনাটুকু গ্রহণ করে নেওয়াই ভালো।
তথ্যসূত্র
[১] শব্দের উৎপত্তি: Online Etymology Dictionary, “atheism”; ও Oxford English Dictionary — গ্রিক ἄθεος (átheos: ἀ- “বিহীন” + θεός “ঈশ্বর”) → ফরাসি athéisme → ইংরেজি, প্রথম প্রয়োগ ~১৫৮৭।
[২] Draper, Paul, “Atheism and Agnosticism”, The Stanford Encyclopedia of Philosophy — নাস্তিকতার মনস্তাত্ত্বিক বনাম প্রস্তাবনামূলক অর্থ; এবং Pojman, L. (ed.), Cambridge Dictionary of Philosophy, “atheism”।
[৩] Rowe, William L., “Atheism”, Concise Routledge Encyclopedia of Philosophy (2000), পৃ. ৬২।
[৪] Martin, Michael, Atheism: A Philosophical Justification (1990); নেতিবাচক/ইতিবাচক (দুর্বল/শক্তিশালী) নাস্তিকতার পার্থক্য প্রসঙ্গে Flew, Martin ও Rowe।
[৫] Smith, George H., Atheism: The Case Against God (1979), পৃ. ১৩–১৮ — প্রচ্ছন্ন ও প্রকাশ্য নাস্তিকতা।
[৬] Huxley, T. H. (১৮৬৯) — “agnostic” শব্দের প্রবর্তন; দ্রষ্টব্য Draper, “Atheism and Agnosticism”, Stanford Encyclopedia of Philosophy।
[৭] Flew, Antony, “The Presumption of Atheism” (1976) — প্রমাণের দায় ও ডিফল্ট অবস্থান হিসেবে অবিশ্বাস।
নবী মুহাম্মদের কিছু কথা কুরআন আর হাদিসে এমনভাবে আছে যেগুলো আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতার সঙ্গে অস্বস্তিকর রকম মিলে যায়। সেই মিলটা ঠিক কতদূর যায়?
১. প্রশ্নটা আসলে কী?
ইসলামের মূল ধর্মীয় বই, কুরআন আর হাদিস পড়ার সময় একটা প্রশ্ন সাধারণত করা হয় না: এই বইগুলো নবী মুহাম্মদকে ঘিরে কেমন সম্পর্ক তৈরি করে? একজন অনুসারীর চোখে নবী মুহাম্মদের জায়গা ঠিক কোথায়? তিনি কি শুধু একজন পথপ্রদর্শক, নাকি এমন একজন, যাঁর প্রতি ভালোবাসা, আনুগত্য আর সম্মান দেখানো ইচ্ছার ব্যাপার নয়, বরং না দেখালেই বিপদ?
আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা বলতে সাধারণত এমন এক স্থায়ী মনোভাব বোঝায়, যেখানে ব্যক্তি নিজের গুরুত্ব, প্রয়োজন ও প্রশংসাকে অন্য সবার ওপরে স্থান দেয় এবং নিজেকে কার্যত সবকিছুর কেন্দ্রে রাখে। মনোরোগবিদ্যার আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় এর সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট রূপটি হলো নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার, যাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে আত্ম-মহিমার অতিরঞ্জিত বোধ, প্রশংসার প্রতি অবিরাম চাহিদা এবং অন্যের প্রতি সহানুভূতির অভাব, এই তিন কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য দিয়ে, যা প্রারম্ভিক প্রাপ্তবয়স্ক জীবন থেকে শুরু হয়ে নানা প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট হয়ে ওঠে (American Psychiatric Association, 2013)। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে অধিকারবোধ অর্থাৎ অনুকূল আচরণ ও আনুগত্যকে প্রাপ্য মনে করা, নিজেকে বিশেষ বা শ্রেষ্ঠ ভাবা, ব্যক্তিগত লাভে অন্যকে ব্যবহার করা, এবং প্রশংসা বা সম্মান না পেলে অপমানবোধ ও প্রতিক্রিয়ামূলক আচরণ (American Psychiatric Association, 2022; World Health Organization, 2019)।
২. ভালোবাসা যখন বাধ্যতামূলক
সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো ব্যাপারটা হলো ইসলামী বইগুলোতে নবী মুহাম্মদের প্রতি ভালোবাসা শুধু একটা ভালো গুণ নয়। এটা বিশ্বাসী হওয়ার শর্ত। তাঁকে ভালো না বাসলে ঈমানই নেই।
“সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের কেউই মুমিন হবে না যতক্ষণ না সে আমাকে তার বাবা আর সন্তানের চেয়েও বেশি ভালোবাসে।”— সহিহ আল-বুখারি ১৪ (আবু হুরায়রা)
আরেকটা বর্ণনায় গণ্ডিটা আরও বড় করে দেওয়া হয়েছে — শুধু পরিবার নয়, গোটা দুনিয়ার সবার চেয়ে বেশি:
“তোমাদের কেউই মুমিন হবে না যতক্ষণ না সে আমাকে তার বাবা, তার সন্তান আর সব মানুষের চেয়েও বেশি ভালোবাসে।”— সহিহ আল-বুখারি ১৫ (আনাস ইবন মালিক)
একটা ঘটনায় বিষয়টা আরও স্পষ্ট। উমর একবার বললেন, মুহাম্মদ তাঁর কাছে নিজের জান ছাড়া বাকি সবকিছুর চেয়ে প্রিয়। মুহাম্মদ সেটাও মেনে নিলেন না:
উমর বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আমার কাছে আমার নিজের জান ছাড়া বাকি সব কিছুর চেয়ে প্রিয়।” নবী বললেন, “না, সেই সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ, যতক্ষণ না আমি তোমার কাছে তোমার নিজের জানের চেয়েও প্রিয় হই।” তখন উমর বললেন, “এখন, আল্লাহর কসম, আপনি আমার নিজের জানের চেয়েও প্রিয়।” নবী বললেন, “এখন ঠিক হলো, উমর।”— সহিহ আল-বুখারি ৬৬৩২
কুরআনও একই সুরে সাবধান করে:
“বলুন, তোমাদের বাবা, সন্তান, ভাই, স্ত্রী, আত্মীয়স্বজন, তোমাদের কামানো সম্পদ, যে ব্যবসায় মন্দার ভয় করো আর যে ঘরবাড়ি তোমাদের পছন্দ — এসব যদি আল্লাহ, তাঁর রাসূল আর তাঁর পথে লড়াইয়ের চেয়ে তোমাদের কাছে বেশি প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা করো, যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর ফয়সালা নিয়ে আসেন।”— কুরআন ৯:২৪ (সূরা আত-তাওবা)
এবার একটু থেমে ভাবুন। একজন মানুষ যখন বলেন, “আমাকে তোমার বাবা-মা-সন্তান, এমনকি নিজের জানের চেয়েও বেশি ভালোবাসতে হবে, নইলে তোমার ঈমান নেই” — এই কথাটা আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতার সঙ্গে অস্বস্তিকরভাবে মিলে যায়। নিজেকে সবার ভালোবাসার একদম শীর্ষে বসিয়ে দেওয়া, আর সেই জায়গা না দিলে শাস্তির ইঙ্গিত, এটা ঠিক সেই ভঙ্গি, যেটা আমরা সাধারণত “আত্মকেন্দ্রিক” মনোভাব বলে চিনি।
৩. আনুগত্য নিয়ে কোনো ছাড় নেই
ভালোবাসার পরেই আসে আনুগত্য। আর সেটাও শর্তহীন। কুরআন রাসূলের আনুগত্যকে সোজা আল্লাহর আনুগত্যের সমান করে দেয়:
“যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর যারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তো তোমাকে তাদের পাহারাদার করে পাঠাইনি।”— কুরআন ৪:৮০ (সূরা আন-নিসা)
“রাসূল তোমাদের যা দেন তা নাও, আর যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে দূরে থাকো। আল্লাহকে ভয় করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তি দেওয়ায় কঠোর।”— কুরআন ৫৯:৭ (সূরা আল-হাশর)
দ্বিমত করার জায়গাটাও প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়:
“আল্লাহ আর তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ে ফয়সালা দিলে কোনো মুমিন নরনারীর জন্য সে বিষয়ে নিজেদের কোনো ইচ্ছা রাখার অধিকার থাকে না।”— কুরআন ৩৩:৩৬ (সূরা আল-আহযাব)
“তোমার রবের কসম, তারা ততক্ষণ মুমিন হবে না যতক্ষণ না তারা নিজেদের বিবাদে তোমাকে বিচারক মানে, তারপর তোমার ফয়সালায় নিজেদের মনে কোনো আপত্তি না রেখে পুরোপুরি মেনে নেয়।”— কুরআন ৪:৬৫ (সূরা আন-নিসা)
এখানেও সেই একই অস্বস্তি ফিরে আসে। মুহাম্মদের নির্দেশকে আল্লাহর নির্দেশের সঙ্গে এক করে ফেলা হয়েছে, আর মনে মনে দ্বিমত রাখাটুকুও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অর্থাৎ তাঁকে প্রশ্ন করা মানেই আল্লাহকে প্রশ্ন করা। যে মানসিকতা নিজের বিরুদ্ধে সামান্যতম আপত্তিও সহ্য করতে চায় না, তার সঙ্গে এই কাঠামোর মিলটা অস্বীকার করা কঠিন।
৪. নিজেই নিজেকে সেরা বলা
এবার তৃতীয় ধাপ — আর এটাই সম্ভবত সবচেয়ে সরাসরি মিলটা দেখায়। শুধু ভালোবাসা আর আনুগত্যের দাবি নয়, মুহাম্মদের মুখে বারবার নিজের শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা। একটা ছোট কিন্তু জরুরি পার্থক্য মনে রাখুন: নিজের গুণের কথা বলা এক জিনিস, আর অন্য সবাইকে নিচে রেখে নিজেকে সবার ওপরে বসানো আরেক জিনিস।
“আমাকে অন্য নবীদের ওপর ছয়টি বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হয়েছে: আমাকে অল্প কথায় অনেক অর্থের বাণী দেওয়া হয়েছে; শত্রুর মনে ভয় ঢুকিয়ে আমাকে সাহায্য করা হয়েছে; যুদ্ধের সম্পদ আমার জন্য হালাল করা হয়েছে; গোটা পৃথিবীকে আমার জন্য পবিত্র আর নামাজের জায়গা করা হয়েছে; আমাকে সব মানুষের কাছে পাঠানো হয়েছে; আর আমাকে দিয়ে নবীদের ধারা শেষ করা হয়েছে।”— সহিহ মুসলিম ৫২৩
“কেয়ামতের দিন আমি হব সব মানুষের নেতা। সবার আগে আমার কবরই খোলা হবে, সবার আগে আমিই সুপারিশ করব, আর সবার আগে আমার সুপারিশই কবুল করা হবে।”— সহিহ আল-বুখারি ৩৩৪০; সহিহ মুসলিম ২২৭৮
এখানে একটা সহজ কথা মনে পড়ে যায়। সত্যিকারের সেরা মানুষটির নিজের প্রশংসা নিজে করার দরকার পড়ে না, অন্যরা তাঁর কাজ দেখেই বুঝে নেয়। কিন্তু যখন সেরা হওয়ার ঘোষণাটা আসে মুহাম্মদের নিজের মুখ থেকেই, বারবার, নানা ভঙ্গিতে, তখন সেটা আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতার সবচেয়ে চেনা লক্ষণটার সঙ্গে মিলে যায়: নিজেকে নিয়ে অবিরাম উঁচু ধারণা, আর সেটা বারবার সবার সামনে জানান দেওয়ার তাগিদ।
৫. “সেরা স্বামী” আর একটা তুলনামূলক আয়াত
আয়িশা থেকে বর্ণিত:
“তোমাদের মধ্যে সেই লোক সবচেয়ে ভালো, যে তার স্ত্রীদের প্রতি সবচেয়ে ভালো। আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার স্ত্রীদের প্রতি সবচেয়ে ভালো।”— জামে আত-তিরমিজি ৩৮৯৫ (হাসান সহিহ)
“সেরা স্বামী” কথাটা একা পড়লে খুবই সুন্দর শোনায়। কিন্তু কুরআনের একটা আয়াত পাশে রাখলে ছবিটা পাল্টে যায়। বর্ণনা অনুযায়ী স্ত্রীদের সঙ্গে একটা মনোমালিন্যের সময় এই আয়াত নাজিল হয়, যেখানে তালাকের ইঙ্গিতসহ “আরও ভালো স্ত্রী” দিয়ে বদলে দেওয়ার কথা বলা হয়:
“হতে পারে, সে যদি তোমাদের সবাইকে তালাক দেয়, তবে তার রব তোমাদের বদলে তাকে তোমাদের চেয়ে ভালো স্ত্রী দেবেন — যারা হবে অনুগত, বিশ্বাসী, বিনয়ী, তওবাকারী, ইবাদতকারী আর রোজাদার; বিধবা কিংবা কুমারী।”— কুরআন ৬৬:৫ (সূরা আত-তাহরিম)
একদিকে নিজেকে “সেরা স্বামী” বলা, অন্যদিকে “আরও ভালো স্ত্রী এনে বদলে দেওয়ার” কথা — দুটো পাশাপাশি রাখলে অস্বস্তিটা আরও গাঢ় হয়। এখানে সেরা হওয়াটা নৈতিক আদর্শের চেয়ে বেশি করে সম্পর্কের ভেতরের ক্ষমতার হিসাবের মতো শোনায়, যেখানে একপক্ষ সবসময় ওপরের আসনে আর অন্যপক্ষ প্রতিস্থাপনযোগ্য।
৬. স্বীকৃতি না দিলে অভিশাপ
শেষ ধাপটা সম্ভবত সবচেয়ে ধারালো। ভালোবাসা, আনুগত্য আর শ্রেষ্ঠত্বের দাবির পাশাপাশি এমন বর্ণনাও আছে, যেখানে মুহাম্মদকে সম্মান না দেখালে সরাসরি অভিশাপ দেওয়া হয় — নিছক ভালো উপদেশ নয়, শাস্তির ভয় দেখানো হয়।
“সে লাঞ্ছিত হোক, যার সামনে আমার নাম নেওয়া হয় অথচ সে আমার ওপর দরুদ পড়ে না। সে-ও লাঞ্ছিত হোক, যার জীবনে রমজান আসে আর চলে যায় অথচ তার গুনাহ মাফ হয় না। আর সে-ও লাঞ্ছিত হোক, যার সামনে তার বাবা-মা বুড়ো হন অথচ তারা তার জান্নাতে যাওয়ার কারণ হন না।”— জামে আত-তিরমিজি ৩৫৪৫ (হাসান)
এই দরুদ পড়ার নির্দেশের ভিত্তি আবার কুরআনেই আছে:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ আর তাঁর ফেরেশতারা নবীর ওপর দরুদ পাঠান। হে বিশ্বাসীরা, তোমরাও তাঁর ওপর দরুদ পড়ো আর যথাযথভাবে সালাম জানাও।”— কুরআন ৩৩:৫৬ (সূরা আল-আহযাব)
এখানে অস্বস্তিটা তুঙ্গে ওঠে। শুধু নিজের নাম শুনে কেউ প্রশংসা না করলেই তার জন্য অপমান আর অভিশাপ কামনা করা — এটা সেই মানসিকতার সঙ্গে হুবহু মিলে যায়, যা প্রশংসা না পেলে অপমানিত বোধ করে আর প্রতিক্রিয়ায় নিন্দা করে বসে।
এবার সবগুলো একসঙ্গে রাখুন
আলাদা আলাদাভাবে দেখলে প্রতিটা কথারই আলাদা ব্যাখ্যা মেলে। কিন্তু একটা লক্ষণ নয়, পাঁচটা লক্ষণ যখন একসঙ্গে বসে — নিজের প্রতি ভালোবাসাকে ঈমানের শর্ত বানানো, নিজের নির্দেশকে ঐশী নির্দেশের সমান করা, বারবার নিজের মুখে সেরা বলা, সম্পর্কেও নিজেকে সেরা ঘোষণা করা, আর সম্মান না পেলে অভিশাপ দেওয়া — তখন সব মিলিয়ে যে ছবিটা তৈরি হয়, সেটা আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতার সঙ্গে অস্বস্তিকরভাবে মিলে যায়। এই মিলটা কল্পনা নয়; কথাগুলো সত্যিই ওই দিকেই ইঙ্গিত করে, আর একজন পাঠক এতে থমকে যেতেই পারেন।
৭. তাহলে শেষমেশ কী দাঁড়াল
এখানেই আসল কথাটা, আর এটা মেপে বলা দরকার।
একদিকে, আত্মকেন্দ্রিকতার বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। কথাগুলো সত্যিই ওই দিকেই ঝুঁকে থাকে, আর মিলটা অস্বস্তিকর রকম কাছাকাছি। কোনো ভক্ত পাঠক এই অস্বস্তি টের পান না, কারণ প্রশ্নটাই কখনও করা হয় না; কিন্তু একবার ধর্মান্ধতা থেকে বের হয়ে চিন্তা করলে সেটা এড়ানো কঠিন।
তথ্যসূত্র
কুরআন
সূরা আন-নিসা — ৪:৮০, ৪:৬৫
সূরা আল-হাশর — ৫৯:৭
সূরা আত-তাওবা — ৯:২৪
সূরা আল-আহযাব — ৩৩:৩৬, ৩৩:৫৬
সূরা আত-তাহরিম — ৬৬:৫
হাদিস
সহিহ আল-বুখারি ১৪ — আবু হুরায়রা বর্ণিত (কিতাব আল-ইমান)
সহিহ আল-বুখারি ১৫ — আনাস ইবন মালিক বর্ণিত (কিতাব আল-ইমান)