আমার সম্পর্কে

আমি একজন মুসলিম হিসেবে বড় হয়েছি, আর আজ আমি ইসলামের অন্যতম তীব্র সমালোচক হিসেবে দাঁড়িয়েছি; যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিকে ব্যবহার করে উন্মোচন করছি তার সেই অন্ধকার সত্যগুলোকে, যা আমি দেখতে পেয়েছি। নিজের শৈশবের দিকে ফিরে তাকালে মনের ভেতর উষ্ণতা ও ক্ষোভের এক অদ্ভুত মিশ্রণ দোলা দেয়। ছোটবেলায় আমি মুহাম্মদকে মনে-প্রাণে ভালোবাসতাম। আমি ছিলাম নিষ্পাপ, তাঁর দয়া ও সহানুভূতির কোমল গল্পগুলো আমাকে গভীরভাবে ছুঁয়ে যেত। আমি বিশ্বাস করতাম যে তিনি এই পৃথিবীতে জন্ম নেওয়া সবচেয়ে অসাধারণ মানুষ ছিলেন, যিনি ধর্ম বা পরিচয় নির্বিশেষে সবাইকে ভালোবাসতেন। তাঁকে আমার কাছে করুণার এক মূর্ত প্রতীক মনে হতো। তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আমি নিজেকে কথা দিয়েছিলাম যে আমিও তাঁর মতোই হবো, কেউ যদি আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করে বা উত্ত্যক্ত করে, তবে আমি রাগের বদলে ভালোবাসা দিয়ে তার জবাব দেব।

কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে কিছু প্রশ্ন আমাকে তাড়া করে বেড়াতে লাগল, যা আমি কোনোভাবেই মন থেকে তাড়িয়ে দিতে পারছিলাম না। সেই কোমলতা ও দয়ার আরও প্রমাণ পাব আশা করে আমি কুরআন ও হাদিসের পাতা ওল্টাতে শুরু করলাম। কিন্তু মূল উৎসগুলো আমাকে এক চরম ধাক্কা দিল। সেখানে আমি যে মুহাম্মদকে খুঁজে পেলাম, তিনি মোটেও সেই কোমল মনের মানুষ ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন নৃশংস যোদ্ধা, যিনি তাঁর নিজ জাতির প্রাচীন বিশ্বাসগুলোকে ভেঙে চুরমার করেছিলেন এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য ধর্মের উপাসনা করা মানুষদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। এই একই রূপ আমি বর্তমান সমাজেও প্রতিফলিত হতে দেখছি, যেখানে ইসলাম ত্যাগ করা মানুষদের হুমকি, সহিংসতা এবং নির্বাসনের মুখোমুখি হতে হয়। আমি ইসলামের ইতিহাস, কুরআন ও হাদিস চষে বেড়ালাম, শুধু একটু ভালো কিছুর সন্ধানে। কিন্তু যা আমি খুঁজে পেলাম, তা আমাকে ক্ষুব্ধ ও ভেতরে ভেতরে অসুস্থ করে তুলল।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার দিনগুলোতে আমার বিশ্বাসের ওপর সন্দেহের এক তীব্র ঝড় বয়ে গেল। আমি যত বেশি পড়তে লাগলাম এবং যত বেশি ইসলামিক বিষয় অধ্যয়ন করলাম, ইসলামের ভেতরের সেই সহিংস আয়াত ও গল্পগুলো তত বেশি আমার সামনে উন্মোচিত হতে লাগল, যেগুলো সাধারণ বিশ্বাসীদের কখনোই শেখানো হয় না, ধর্মের এই কঠোর রূপটি লুকিয়ে রাখার জন্য যা সবসময় চেপে যাওয়া হয়। বন্ধুরা আমার এই প্রশ্নগুলো খেয়াল করতে শুরু করল এবং ধীরে ধীরে আমাকে এড়িয়ে চলতে লাগল। এই একাকীত্ব আমাকে ভীষণ কষ্ট দিত। পরবর্তীতে যখন আমি আমার সহকর্মীদের কাছে নিজের এই সন্দেহের কথা প্রকাশ করলাম, তারা শুধু এটুকুই বলল যে আমার ঈমান বা বিশ্বাস দুর্বল হয়ে গেছে এবং আমার নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া উচিত। মনের সেই পুরনো শান্তি ফিরে পাওয়ার আকুলতা নিয়ে আমি চেষ্টাও করেছিলাম। কিন্তু প্রার্থনা বা ইবাদত আমার জানা সত্যগুলোকে চাপা দিতে পারল না। আমি বুঝতে পারলাম যে ইসলামের মূল ভিত্তি আসলে নিয়ন্ত্রণ এবং অমুসলিমদের প্রতি বৈরিতা, কোনো দয়া বা করুণা নয়। আমি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছালাম যে সব ধর্ম, ঈশ্বর এবং নবী-রাসূল আসলে কাল্পনিক উপাখ্যান মাত্র, যা মানুষকে অন্ধ করে রাখে। একপর্যায়ে পারিবারিক পরিস্থিতির কারণে আমাকে নিজের ঘর ছাড়তে হলো এবং আমি ইসলামকে পুরোপুরি বিদায় জানালাম।

আমার ভেতরের ক্ষোভ প্রকাশের একটা পথ খুঁজছিলাম, আমাকে মুখ খুলতেই হতো। কিন্তু আমি যেখানে বাস করতাম, সেখানে এক তীব্র ভয় আমাকে চুপ করিয়ে রাখত। ধর্মের সমালোচনা বিরোধী আইন এবং উগ্র জনতা কর্তৃক সহিংসতার আশঙ্কায় আমার জীবন যেকোনো সময় চলে যেতে পারত। আমি চোখের সামনে মানুষকে দেখেছি ধর্মের বাণী ব্যবহার করে সন্ত্রাসবাদের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে, বিশ্বাসকে রূপান্তর করতে ঘৃণার এক হাতিয়ারে। সূরা আত-তাওবাহ (৯:২৯)-এর কথাই ধরা যাক, যেখানে অমুসলিমরা বশ্যতা স্বীকার না করা এবং অপমানিত হয়ে জিজিয়া কর না দেওয়া পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অথবা সহীহ বুখারী (হাদিস ২৫), যেখানে উল্লেখ আছে যে মুহাম্মদ বলেছেন, মানুষ যতক্ষণ না আল্লাহ ও তাঁর নবুওয়াতকে মেনে নিচ্ছে, ততক্ষণ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।

আমি বনু কুরাইজা উপজাতির পুরুষদের গণহত্যার ইতিহাস পড়লাম। এমনকি যে গ্রন্থ নিজের ঈশ্বরকে ‘পরম দয়ালু’ বলে দাবি করে, সেখানেও সূরা আনফালের ১২ নম্বর আয়াতের মতো অনুচ্ছেদ রয়েছে, যেখানে অবিশ্বাসীদের হৃদয়ে ভীতি সঞ্চার করার এবং তাদের ঘাড়ে ও আঙুলের জোড়ায় আঘাত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়গুলো আমাকে মানসিকভাবে অসুস্থ করে দিত। আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম যে, আইএসআইএস (ISIS) বা আল-কায়েদার মতো গোষ্ঠীগুলো এই ঐতিহ্যকে বিকৃত করছে না, বরং তারা হুবহু এর অনুকরণ করছে। এই ধারণাগুলোর মুখোমুখি সততার সাথে না দাঁড়ালে আমি মনে করি না পৃথিবীতে কখনো প্রকৃত শান্তি আসা সম্ভব।

অবশেষে, কেবল নিজের মতামত প্রকাশের অপরাধে মৃত্যুর হুমকি পেয়ে আমাকে আমার জন্মভূমি ছেড়ে ভিনদেশে আসতে হলো। ইন্টারনেটের দুনিয়ায় আমি আজও কথা বলে যাচ্ছি, একজন নায়ক হিসেবে মুহাম্মদের যে ভাবমূর্তি তৈরি করা হয়েছে তাকে চ্যালেঞ্জ করছি এবং মূল উৎসগুলোতে আসলে কী লেখা আছে তা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছি। এর জন্য আমি শত শত হুমকি এবং অবিরাম হেনস্থার শিকার হয়েছি, যা আমার ভেতরের সংকল্পকে আরও দৃঢ় করেছে। আমার এই লেখালিখিই হলো আমার লড়াই, কুরআন, হাদিস এবং ইতিহাস থেকে তুলে আনা ইসলামের তথাকথিত ভয়াবহতার এক পূর্ণাঙ্গ খতিয়ান। আমি আমার সবকিছু এর পেছনে ঢেলে দিয়েছি, যাতে কোনো উগ্রবাদী যদি কখনো আমার কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধও করে দেয়, তাও যেন আমার এই শব্দগুলো অন্যদের ঘুম ভাঙানোর জন্য টিকে থাকে।

আজ, সমস্ত ধর্মকে বর্জন করার পর, আমি মানুষকে বিচার করি কেবল তাদের কর্ম দিয়ে। যারা নিজেদের ধর্ম অন্যের ওপর জোর করে চাপিয়ে দিতে চায়, অন্য ধর্মকে ঘৃণা করে, নারীদের নিকৃষ্ট মনে করে কিংবা সংখ্যালঘুদের ছোট নজরে দেখে, তাদের থেকে আমি সবসময় দূরত্ব বজায় রাখি। আমি লক্ষ্য করি একজন মানুষ সমাজের সবচেয়ে কম ক্ষমতাবান মানুষের সাথে কেমন আচরণ করছে, যেমন ঘরের পরিচারিকা, রেস্তোরাঁর ওয়েটার কিংবা রাস্তার হকার। সেখানে সামান্যতম নিষ্ঠুরতা দেখলেও আমি কোনো আফসোস ছাড়াই সেই বন্ধুত্বে ইতি টানি। এভাবেই আমি নিজেকে নিজের মতো করে বাঁচিয়ে রাখি।”