এই প্রবন্ধে নবী মুহাম্মদের বৈবাহিক জীবন, নারীর প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ, আয়েশার সঙ্গে বাল্যবিবাহ, যুদ্ধবন্দি নারীদের গ্রহণ এবং দাসী-সম্পর্কিত বিধান ধর্মনিরপেক্ষ, যুক্তিনির্ভর ও মানবাধিকারভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। উপাত্ত নেওয়া হয়েছে মূলত কুরআন, সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসাঈ, ইবনে ইসহাক-ইবনে হিশামের সিরাত, ইবনে সাদের তাবাকাত এবং তাবারির তারিখ ও তাফসির থেকে; অর্থাৎ মুসলিম ঐতিহ্যেরই সর্বাধিক গৃহীত উৎস থেকে।
ইসলামি ধর্মতত্ত্ব মুহাম্মদকে সর্বকালের জন্য “উত্তম আদর্শ” (উসওয়াতুন হাসানাহ, কুরআন ৩৩:২১) এবং সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত (৩৪:২৮) বলে দাবি করে। এই সর্বজনীনতার দাবি থাকলে তাঁর আচরণকে কেবল সপ্তম শতাব্দীর আরব মানদণ্ডে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ থাকে না; বরং আধুনিক মানবাধিকার আইন, শিশু অধিকার সনদ এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের আলোকে তা মূল্যায়ন করা যৌক্তিকভাবেই প্রাসঙ্গিক। বিশ্লেষণে দেখা যায়, অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে (নাবালিকা বিবাহ, যুদ্ধবন্দি নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক এবং দাসপ্রথার বৈধতা) ঐতিহ্যগত বর্ণনাগুলো আজকের সর্বজনীন মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক।
ভূমিকা
ধর্মপ্রবর্তকদের ব্যক্তিগত জীবন সাধারণত ইতিহাসবিদদের আগ্রহের বিষয় হলেও ইসলামের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইসলামি আইনশাস্ত্রে (ফিকহ) নবীর কথা, কাজ ও মৌন সম্মতি, অর্থাৎ সুন্নাহ, কুরআনের পরেই আইনের দ্বিতীয় প্রধান উৎস। ফলে মুহাম্মদ কাকে, কখন, কোন বয়সে বিয়ে করেছেন, যুদ্ধে বন্দি নারীদের সঙ্গে কী আচরণ করেছেন, দাসীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেমন ছিল, এসব প্রশ্ন কেবল ঐতিহাসিক কৌতূহল নয়; এগুলো চৌদ্দ শতাব্দী ধরে কোটি মানুষের পারিবারিক আইন, বিবাহের বয়স ও নারীর আইনি মর্যাদা নির্ধারণ করেছে এবং আজও করছে।
অনেকে প্রশ্ন তুলবেন যে ইতিহাসচর্চায় একটি সাধারণ নীতি হলো, অতীতের মানুষকে তাঁদের সময়ের প্রেক্ষাপটে বোঝা উচিত। এই নীতি সাধারণ ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে যৌক্তিক। জুলিয়াস সিজার বা চেঙ্গিস খানকে কেউ চিরন্তন নৈতিক আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করে না। কিন্তু ইসলামি ধর্মতত্ত্ব মুহাম্মদ সম্পর্কে ভিন্ন ও অনেক বড় দাবি করে:
“নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসুলের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ” (কুরআন ৩৩:২১)। “আমি তোমাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে পাঠিয়েছি” (৩৪:২৮)। “আমি তোমাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছি” (২১:১০৭)। “নিশ্চয়ই তুমি মহান চরিত্রের অধিকারী” (৬৮:৪)। তিনি শেষ নবী (খাতামুন নাবিয়্যিন, ৩৩:৪০); অর্থাৎ তাঁর পরে আর কোনো সংশোধনী বা নতুন নৈতিক নির্দেশনা আসবে না।
এই দাবিগুলো একসঙ্গে পড়লে যুক্তিটি দাঁড়ায় এরকম: যদি মুহাম্মদের আচরণ সর্বকালের সব মানুষের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ হয়, তাহলে তা বর্তমান কালের মানুষের জন্যও আদর্শ। আর যদি এই যুগের মানুষের জন্য আদর্শ হয়, তাহলে একইভাবে এই যুগের নৈতিক ও আইনি মানদণ্ডে তা পরীক্ষা করা কেবল বৈধই নয়, অপরিহার্য। কোনো দাবি যত বড়, তার প্রমাণের দায়ও তত বড়। সর্বকালীন আদর্শের দাবি করে আবার কেবল সপ্তম শতাব্দীর মানদণ্ডে বিচারের দাবি করা যৌক্তিকভাবে অসংগত; একে দর্শনে “বিশেষ ছাড়ের আবেদন” (special pleading) বলা হয়।
মুহাম্মদের বৈবাহিক জীবনের রূপরেখা
ক্লাসিক্যাল উৎসে মুহাম্মদের স্ত্রীর সংখ্যা নিয়ে সামান্য মতভেদ থাকলেও সর্বাধিক গৃহীত তালিকায় এগারো থেকে তেরো জনের নাম পাওয়া যায়, যাঁদের সঙ্গে বিবাহ সম্পন্ন ও দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। মৃত্যুর সময় তাঁর নয়জন স্ত্রী জীবিত ছিলেন। নিচের সারণিতে ইবনে হিশাম, ইবনে সাদ ও তাবারির ভিত্তিতে মূল তথ্য দেওয়া হলো।
| নাম | বিবাহের আনুমানিক সময় | প্রাসঙ্গিক তথ্য |
| খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ | আনু. ৫৯৫ খ্রি. | ধনী ব্যবসায়ী বিধবা; প্রায় ২৫ বছর একমাত্র স্ত্রী; ৬১৯ খ্রি.-এ মৃত্যু। |
| সাওদা বিনতে জামআ | ৬১৯–৬২০ | বিধবা; পরে তালাকের আশঙ্কায় নিজের পালার রাত আয়েশাকে দেন (বুখারি ৫২১২)। |
| আয়েশা বিনতে আবু বকর | আকদ ৬১৯–৬২০; সহবাস ৬২৩–৬২৪ | সহিহ বর্ণনা অনুযায়ী আকদের সময় ৬, সহবাসের সময় ৯ বছর। একমাত্র কুমারী স্ত্রী। |
| হাফসা বিনতে উমর | ৬২৫ | বিধবা; উমরের কন্যা। |
| জয়নাব বিনতে খুযাইমা | ৬২৫ | বিধবা; বিয়ের কয়েক মাস পর মৃত্যু। |
| উম্মে সালামা | ৬২৬ | বিধবা, সন্তানসহ। |
| জয়নাব বিনতে জাহশ | ৬২৬–৬২৭ | পালকপুত্র যায়েদ ইবনে হারিসার তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী; কুরআন ৩৩:৩৭। |
| জুওয়াইরিয়া বিনতে হারিস | ৬২৭–৬২৮ | বনু মুস্তালিক যুদ্ধে বন্দি; গোত্রপ্রধানের কন্যা। |
| উম্মে হাবিবা (রামলা) | ৬২৮ | আবু সুফিয়ানের কন্যা; আবিসিনিয়ায় থাকাকালীন প্রক্সি-বিবাহ। |
| সাফিয়া বিনতে হুয়াই | ৬২৮ | খায়বার যুদ্ধে বন্দি; পিতা, স্বামী ও আত্মীয়রা নিহত। |
| মায়মুনা বিনতে হারিস | ৬২৯ | বিধবা; শেষ বিবাহ। |
| মারিয়া আল-কিবতিয়া | ৬২৮–৬২৯ | মিশরের শাসক মুকাওকিসের উপহার দেওয়া দাসী; পুত্র ইবরাহিমের মা। |
| রায়হানা বিনতে যায়েদ | ৬২৭ | বনু কুরাইজা থেকে বন্দি; স্ত্রী নাকি দাসী, তা নিয়ে মতভেদ আছে। |
একবিবাহ থেকে বহুবিবাহ
মুহাম্মদের জীবনে একটি স্পষ্ট বিভাজনরেখা রয়েছে। খাদিজার সঙ্গে প্রায় পঁচিশ বছরের দাম্পত্যে তিনি ছিলেন একবিবাহী। খাদিজার মৃত্যুর পর, বিশেষ করে মদিনায় হিজরতের (৬২২) পর রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিবাহের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ে। মদিনার দশ বছরে তিনি অন্তত দশটি বিবাহ করেন, যার মধ্যে দুজন (জুওয়াইরিয়া ও সাফিয়া) সরাসরি যুদ্ধবন্দি এবং অন্তত দুজন (মারিয়া ও রায়হানা) দাসী হিসেবে উল্লিখিত।
আপোলজেটিক ভাষায় প্রায়ই বলা হয় যে খাদিজার সঙ্গে দীর্ঘ একবিবাহ প্রমাণ করে তাঁর বিবাহগুলো কামনাপ্রসূত ছিল না। কিন্তু এই যুক্তির একটি সমস্যা হলো, খাদিজার সঙ্গে বিবাহকালীন সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। খাদিজা ছিলেন ধনী ও প্রভাবশালী, মুহাম্মদ ছিলেন তাঁর কর্মচারী এবং অর্থনৈতিকভাবে তাঁর ওপর নির্ভরশীল। ইবনে সাদ ও অন্য সিরাত লেখকদের বর্ণনায় দেখা যায় বিবাহের প্রস্তাবও খাদিজার দিক থেকে এসেছিল। অর্থাৎ ক্ষমতার সমীকরণ তখন ভিন্ন ছিল। ক্ষমতা অর্জনের পর আচরণের পরিবর্তনকে ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে উপেক্ষা করা যায় না।
কুরআনে নবীর জন্য বিশেষ ছাড়
কুরআন সাধারণ মুসলিম পুরুষের জন্য একসঙ্গে সর্বোচ্চ চারজন স্ত্রী নির্ধারণ করেছে (৪:৩)। কিন্তু নবীর ক্ষেত্রে এই সীমা প্রযোজ্য ছিল না। সূরা আহজাবের ৫০ নম্বর আয়াতে নবীর জন্য বৈধ নারীদের একটি দীর্ঘ তালিকা দেওয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে কোনো মুমিন নারী যদি নিজেকে নবীর কাছে সমর্পণ করে এবং নবী তাকে বিয়ে করতে চান, তবে তা বৈধ, এবং এই সুবিধা “বিশেষভাবে তোমার জন্য, অন্য মুমিনদের জন্য নয়”।
পরের আয়াতে (৩৩:৫১) নবীকে স্ত্রীদের মধ্যে পালা বণ্টনের বাধ্যবাধকতা থেকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়: “তুমি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা দূরে রাখতে পারো এবং যাকে ইচ্ছা কাছে রাখতে পারো।” অথচ সাধারণ মুসলিমদের জন্য স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায়বিচার বাধ্যতামূলক (৪:৩, ৪:১২৯)।
এই প্রসঙ্গে সহিহ বুখারিতে আয়েশার একটি মন্তব্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। যেসব নারী নিজেদের নবীর কাছে সমর্পণ করতেন তাঁদের প্রতি আয়েশা বিরক্তি প্রকাশ করতেন এবং বলতেন, একজন নারী কীভাবে নিজেকে সমর্পণ করতে পারে! এরপর যখন ৩৩:৫১ আয়াত নাজিল হলো, আয়েশা বললেন:
“আমি দেখছি, আপনার রব আপনার ইচ্ছা পূরণে দ্রুত সাড়া দেন।” (সহিহ বুখারি ৪৭৮৮, কিতাবুত তাফসির; সহিহ মুসলিম ১৪৬৪)
এটি কোনো সমালোচকের বানানো কথা নয়; এটি নবীর সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রীর মুখ থেকে সর্বোচ্চ বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থে সংরক্ষিত। একজন যুক্তিবাদী পাঠকের কাছে প্রশ্নটি স্বাভাবিক: যখন ঐশী বিধান বারবার আইনপ্রণেতার ব্যক্তিগত সুবিধার অনুকূলে আসে, এবং তা এমন ক্ষেত্রে যেখানে অন্যদের ওপর কঠোর সীমা আরোপিত, তখন তা স্বার্থের সংঘাত (conflict of interest) হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য কি না। আধুনিক আইনি ও প্রশাসনিক নীতিতে এমন একজন আইনপ্রণেতা, যিনি নিজের জন্য নিয়মের ব্যতিক্রম তৈরি করেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মৌলিক নীতি লঙ্ঘন করছেন বলে গণ্য হতেন।
মুহাম্মদের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রীদের পুনর্বিবাহ চিরতরে নিষিদ্ধ করা হয় (৩৩:৫৩)। অর্থাৎ বহু তরুণ বিধবা, যেমন নবীর মৃত্যুর সময় মাত্র আঠারো বছর বয়সী আয়েশা, আজীবন একাকী থাকতে বাধ্য হন। অথচ, অন্য ব্যক্তিদের বিধবা স্ত্রীদেরকে মুহাম্মদ বিয়ে করেছিল (উপরের স্ত্রীদের তালিকা দেখুন) শুধু তাই নয়, আক্রমণাত্মক যুদ্ধে বন্দি বিবাহিত নারীদের জোরপূর্বক ধর্ষণ করতে এই মুহম্মদ অনুমতি দিয়েছিল (এ সংক্রান্ত হাদিস নিচের অংশে দেয়া আছে)।
নারীর প্রতি অতিমাত্রায় আকর্ষণ
আনাস ইবনে মালিক বর্ণনা করেন, নবী দিন বা রাতের একটি নির্দিষ্ট সময়ে তাঁর সব স্ত্রীর কাছে পর্যায়ক্রমে যেতেন, এবং তাঁরা সংখ্যায় এগারোজন ছিলেন। জিজ্ঞাসা করা হলো, তিনি কি এতে সক্ষম ছিলেন? আনাস বললেন, আমরা বলাবলি করতাম যে তাঁকে ত্রিশজন পুরুষের শক্তি দেওয়া হয়েছে (সহিহ বুখারি ২৬৮)।
আপনি কল্পনা করুন, যে ব্যক্তি প্রতদিন ১১ জন স্ত্রীর কাছে পালাক্রমে শারীরিক সম্পর্ক করতে যেত তার অন্য কিছু করার সময় কিভাবে হতো? একজনের সাথে ৩০ মিনিট করে ধরলেও প্রতিদিন ৫ ঘণ্টার বেশি সময় দিত শারীরিক চাহিদা পূরণ করার জন্য, এমন একজন ব্যক্তিকে আপনি নবী হিসেবে মনে করলে, আপনার মানসিক বিকলাঙ্গতার সমূহ সম্ভাবনা দেখছি।
চলুন কিছু হাদিস দেখে নেই, “তোমাদের দুনিয়ার মধ্যে আমার কাছে প্রিয় করা হয়েছে নারী ও সুগন্ধি, আর আমার চোখের শীতলতা রাখা হয়েছে নামাজে” (সুনানে নাসাঈ ৩৯৩৯; সনদকে অনেক মুহাদ্দিস হাসান বা সহিহ বলেছেন)।
সূরা তাহরিমের (৬৬:১–৫) প্রেক্ষাপটে স্ত্রীদের মধ্যে ঈর্ষা, গোপন কথা ফাঁস এবং নবীর সব স্ত্রীকে তালাক দিয়ে “উত্তম” স্ত্রী দেওয়ার হুমকি (৬৬:৫) উল্লিখিত হয়েছে। এর প্রেক্ষাপট সম্পর্কে দুটি বর্ণনা আছে, যা লেখার নিচের অংশে আলোচিত হয়েছে।
মুসলিম ঐতিহ্যে এসব বর্ণনাকে নবীর পৌরুষ ও পূর্ণতার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। একজন ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্লেষকের কাছে প্রশ্নটি ভিন্ন: যে ব্যক্তি নিজের জন্য চার স্ত্রীর সীমা, পালা বণ্টনের দায় এবং অন্যান্য নিয়ম থেকে ছাড় পান, এবং যাঁর বিবাহের সংখ্যা ক্ষমতার সঙ্গে সমানুপাতিকভাবে বাড়ে, তাঁর যৌন ও বৈবাহিক আচরণকে “সর্বকালের উত্তম আদর্শ” বলা কতটা যৌক্তিক? বিশেষ করে যখন অন্য যেকোনো ক্ষমতাধর পুরুষের ক্ষেত্রে একই আচরণ আমরা ক্ষমতার অপব্যবহারের নিদর্শন হিসেবে জানি।
মুহাম্মদের সাথে আয়েশার বাল্যবিবাহ
আয়েশার বিবাহের বয়স সম্পর্কে সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে একাধিক বর্ণনা রয়েছে, যা পরস্পরকে সমর্থন করে:
আয়েশা বর্ণনা করেন: “নবী যখন আমাকে বিয়ে করেন তখন আমার বয়স ছিল ছয় বছর, এবং আমার নয় বছর বয়সে তিনি আমার সঙ্গে দাম্পত্য জীবন শুরু করেন।” (সহিহ বুখারি ৫১৩৩, ৫১৩৪, ৫১৫৮, ৩৮৯৪; সহিহ মুসলিম ১৪২২)
বুখারি ৩৮৯৪-এর দীর্ঘ বর্ণনায় আয়েশা বলেন, দাম্পত্য শুরুর দিন তিনি বান্ধবীদের সঙ্গে দোলনায় খেলছিলেন; তাঁর মা তাঁকে ডেকে নিয়ে গেলেন, হাঁপানো অবস্থায় দরজায় দাঁড় করালেন, মুখ ধুইয়ে দিলেন, তারপর আনসারি নারীরা তাঁকে সাজিয়ে দিলেন, এবং মধ্যাহ্নে নবী এলেন। সুনানে আবু দাউদে (৪৯৩৩) একই ঘটনার বর্ণনায় আছে যে তখন তাঁর চুল ছোট করে কাটা ছিল এবং তিনি দোলনা থেকে নেমে এসেছিলেন।
সহিহ মুসলিমের একটি বর্ণনায় (১৪২২) যোগ করা হয়েছে: “তাঁর খেলনা-পুতুল তাঁর সঙ্গে ছিল, এবং নবী যখন মারা যান তখন তাঁর বয়স আঠারো।” বুখারি ৬১৩০-এ আয়েশা বলেন, তিনি নবীর উপস্থিতিতে পুতুল নিয়ে খেলতেন এবং তাঁর বান্ধবীরাও খেলত। এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইবনে হাজার আসকালানি (ফাতহুল বারি) উল্লেখ করেছেন যে আলেমগণ এ থেকে মেয়েশিশুদের পুতুল খেলার বৈধতা নিয়েছেন, কারণ এটি তাদের ঘরকন্নার প্রশিক্ষণ, এবং আয়েশা তখন ছোট ছিলেন, প্রাপ্তবয়স্ক হননি। অর্থাৎ ক্লাসিক্যাল ভাষ্যকারও বয়সের এই বর্ণনাকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করেছেন।
ইসলামে বাল্যবিবাহের আইনি বৈধতা
আয়েশার বিবাহ কোনো বিচ্ছিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে থেকে যায়নি; এটি ইসলামি আইনে নাবালিকা বিবাহের বৈধতার প্রধান দলিল হয়ে উঠেছে। সহিহ বুখারিতে ইমাম বুখারি একটি অধ্যায়ের শিরোনাম দিয়েছেন: “কেউ নিজের নাবালক সন্তানদের বিয়ে দিলে” (বাবু ইনকাহির রাজুলি ওয়ালাদাহুস সিগার), এবং সেখানে দলিল হিসেবে কুরআন ৬৫:৪ উদ্ধৃত করেছেন।
কুরআনের ৬৫:৪ আয়াতে তালাকপ্রাপ্ত নারীর ইদ্দত (অপেক্ষাকাল) সম্পর্কে বলা হয়েছে: যারা ঋতুস্রাবের বয়স পেরিয়ে গেছে তাদের ইদ্দত তিন মাস, “এবং যাদের এখনো ঋতুস্রাব হয়নি (ওয়াল্লাঈ লাম ইয়াহিদনা), তাদেরও”। তাবারি, ইবনে কাসির, কুরতুবিসহ প্রধান ক্লাসিক্যাল মুফাসসিরগণ “যাদের এখনো ঋতুস্রাব হয়নি” অংশটিকে অল্পবয়সী, প্রাক-বয়ঃসন্ধি মেয়েদের অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন। ইদ্দত কেবল তখনই প্রাসঙ্গিক যখন বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে এবং (সাধারণ নিয়মে) দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে, কারণ দাম্পত্যের আগে তালাক হলে ইদ্দত নেই (৩৩:৪৯)। ফলে ক্লাসিক্যাল ব্যাখ্যা অনুযায়ী এই আয়াত প্রাক-বয়ঃসন্ধি মেয়ের সঙ্গে বিবাহ ও দাম্পত্যকে স্বীকৃতি দেয়।
চার সুন্নি মাযহাবই পিতা (এবং শাফেয়ি মতে দাদা) কর্তৃক নাবালিকা কন্যাকে তার সম্মতি ছাড়া বিয়ে দেওয়ার অধিকার (ইজবার) স্বীকার করে। দাম্পত্যের সময় নির্ধারণে অধিকাংশ ফকিহ নির্দিষ্ট বয়সের পরিবর্তে মেয়েটির শারীরিকভাবে “সহ্য করার সক্ষমতা” (ইতাকাতুল ওয়াত) মানদণ্ড ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ ক্লাসিক্যাল ফিকহে বিবাহের কোনো ন্যূনতম বয়স নেই, আর দাম্পত্যের মানদণ্ড শারীরিক, মানসিক বা সম্মতিভিত্তিক নয়।
একটি মজার ব্যপার দেখুন, যেই মুহাম্মদ ছয় বছরের একটি শিশুকে বিয়ে করেছে, ঠিক তার বিপরীতভাবে নিজের মেয়ে ফাতিমাকে ১৪/১৫ বছর বয়সে আবু বকর এবং উমর বিয়ের প্রস্তাব দিলে মুহাম্মদ তাদের এই বলে মানা করে দেয় যে, তার মেয়ে ছোট। সুনানে আন-নাসায়ী : ৩২২১, আবু বকর ও উমর (রাঃ) ফাতিমা (রাঃ)-এর বিবাহের প্রস্তাব পেশ করলে মুহাম্মদ বললেন: সে তো অল্পবয়স্কা।
আধুনিক আইন ও বিজ্ঞানের আলোকে এই বাল্যবিবাহ
আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনে বাল্যবিবাহ একটি মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে স্বীকৃত: UDHR অনুচ্ছেদ ১৬(২): বিবাহ কেবল ইচ্ছুক দম্পতির স্বাধীন ও পূর্ণ সম্মতিতেই সম্পন্ন হবে। ছয় বছরের শিশুর “স্বাধীন ও পূর্ণ সম্মতি” ধারণাগতভাবেই অসম্ভব। শিশু অধিকার সনদ (CRC): আঠারো বছরের কম প্রত্যেক ব্যক্তি শিশু (অনুচ্ছেদ ১); রাষ্ট্র শিশুকে সব ধরনের যৌন শোষণ ও নির্যাতন থেকে রক্ষা করবে (অনুচ্ছেদ ৩৪)।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের দিক থেকেও বিষয়টি পরিষ্কার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী কিশোরী মাতৃত্ব মাতৃমৃত্যু, অবস্ট্রেটিক ফিস্টুলা, অপরিণত জন্ম এবং শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়; বয়স যত কম, ঝুঁকি তত বেশি। মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণাও দেখায় যে বাল্যবিবাহ শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া, পারিবারিক সহিংসতা, বিষণ্নতা ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাতের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে সম্পর্কিত। “বয়ঃসন্ধি হলেই বিবাহযোগ্য” এই ধারণা জীববিজ্ঞানের দিক থেকেও ভুল: ঋতুস্রাব শুরু হওয়া মানে শরীর বা মস্তিষ্ক পূর্ণ পরিপক্বতায় পৌঁছানো নয়। মস্তিষ্কের যে অংশ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিণাম বিবেচনার জন্য দায়ী (প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স), তার বিকাশ বিশের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলে।
বাস্তব পরিণতি এবং বর্তমান অবস্থা
আয়েশার বিবাহ যদি কেবল একটি অতীত ঘটনা হতো, তবে তা ইতিহাসবিদদের বিতর্কের বিষয় হয়ে থাকত। কিন্তু সুন্নাহর আইনি মর্যাদার কারণে এটি আজও রাজনৈতিক ও আইনি প্রভাব রাখে। ইয়েমেনে বিবাহের ন্যূনতম বয়স নির্ধারণের আইনি প্রচেষ্টা একাধিকবার ধর্মীয় বিরোধিতায় আটকে গেছে, এবং বিরোধীরা সরাসরি আয়েশার দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছেন। ইরানের দেওয়ানি আইনে মেয়েদের বিবাহের সাধারণ বয়স ১৩, এবং আদালতের অনুমতিসাপেক্ষে এর চেয়েও কম বয়সে বিবাহ সম্ভব। বাংলাদেশে ইউনিসেফের হিসাবে বাল্যবিবাহের হার দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চগুলোর একটি, এবং ধর্মীয় বক্তাদের একটি অংশ প্রকাশ্যে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনকে “শরিয়াহবিরোধী” বলে প্রচার করেন।
এখানেই সর্বজনীনতার দাবির প্রকৃত পরিণতি দৃশ্যমান হয়। একটি ঐতিহাসিক আচরণকে যখন চিরন্তন আদর্শের মর্যাদা দেওয়া হয়, তখন তা আর ইতিহাস থাকে না; তা বর্তমানের শিশুদের জীবন নির্ধারণ করে।
জয়নাব বিনতে জাহশ: পালকপুত্রের স্ত্রী
জায়েদ ও মুহাম্মদের সম্পর্ক
এ বিষয়ে জানার আগে জায়েদ ও মুহাম্মদের সম্পর্ক নিয়ে জানতে হবে। ইবনে সাদের তাবাকাতুল কুবরায় (৩য় খণ্ড, যায়েদ ইবনে হারিসার জীবনী)। পরে ইবনে আবদিল বার (আল-ইসতিআব) ও ইবনে হাজার (আল-ইসাবা) এটি উদ্ধৃত করেছেন।
শৈশবে যায়েদ অপহৃত হয়ে দাস হিসেবে বিক্রি হন। হাকিম ইবনে হিযাম তাঁকে কিনে ফুফু খাদিজাকে দেন, আর খাদিজা তাঁকে মুহাম্মদকে উপহার দেন। যায়েদের পিতা হারিসা ও চাচা কাব খোঁজ পেয়ে মুক্তিপণ নিয়ে মক্কায় আসেন। মুহাম্মদ যায়েদকে বেছে নেওয়ার সুযোগ দেন। যায়েদ নিজের পরিবারের বদলে মুহাম্মদের কাছে থাকা বেছে নেন। এরপর মুহাম্মদ তাঁকে কাবার হিজরে (হাতিম) নিয়ে গিয়ে ঘোষণা করেন: “يا من حضر، اشهدوا أن زيدا ابني، يرثني وأرثه”, অর্থাৎ উপস্থিত সবাই সাক্ষী থাকো, যায়েদ আমার পুত্র, সে আমার উত্তরাধিকারী হবে এবং আমি তার। পিতা ও চাচা সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে যান। তখন থেকে তাঁকে “যায়েদ ইবনে মুহাম্মদ” ডাকা হতো।
বুখারী ৪৭৮২, মুসলিম ২৪২৫ (ইবনে উমরের সূত্রে): আমরা যায়েদ ইবনে হারিসাকে “যায়েদ ইবনে মুহাম্মদ” ছাড়া অন্য নামে ডাকতাম না, যতক্ষণ না আয়াত নাজিল হয়: “ادعوهم لآبائهم” (তাদের পিতার নামে ডাকো, সূরা আহযাব ৩৩:৫)।
বুখারী ৪০০০ (আয়েশার সূত্রে): আবু হুজাইফা সালিমকে পালক পুত্র করেছিলেন, যেভাবে নবী যায়েদকে করেছিলেন। জাহেলি যুগে কেউ কাউকে পালক পুত্র করলে লোকে তাকে পালক পিতার নামে ডাকত এবং সে উত্তরাধিকারও পেত, যতক্ষণ না উপরোক্ত আয়াত নাজিল হয়।
তিরমিযী ৩৮১৫ (যায়েদের ভাই জাবালা ইবনে হারিসার সূত্রে): জাবালা নবীর কাছে এসে যায়েদকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চান। নবী বলেন, সে এখানে আছে, যেতে চাইলে বাধা দেব না। যায়েদ বলেন, আমি আপনার ওপর কাউকে বেছে নেব না।
এ ঘটনা থেকে এ বিষয় স্পষ্ট যে, জায়েদ মুহাম্মদকে নিজের বাবার চেয়ে বেশি ভালোবাসতো, তাই বাবার পরিবর্তে মুহাম্মদের কাছে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়, এবং মুহাম্মদ সেই প্রতিদান হিসেবে জায়েদকে নিজের পুত্র এবং উত্তরাধিকার ঘোষণা করে।
মুহাম্মদ ও জয়নাবের প্রণয়
জয়নাব বিনতে জাহশ ছিলেন মুহাম্মদের ফুফাতো বোন। মুহাম্মদ নিজেই তাঁকে তাঁর পালকপুত্র যায়েদের সঙ্গে বিয়ে দেন, যদিও জয়নাব ও তাঁর পরিবার প্রথমে রাজি ছিলেন না। তখন কুরআন ৩৩:৩৬ নাজিল হয়: আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয়ে ফয়সালা দিলে কোনো মুমিন নারী বা পুরুষের নিজস্ব সিদ্ধান্তের অধিকার থাকে না।
ইবনে সাদ, তাবাকাত (৮ম খণ্ড, যায়নাবের জীবনী), সূত্র: ওয়াকিদি → আবদুল্লাহ ইবনে আমির আল-আসলামি → মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে হিব্বান থেকে বর্ণিত, নবী জায়েদের খোঁজে তাঁর বাড়িতে যান, জায়েদ ঘরে ছিলেন না। জয়নাব তাড়াতাড়ি উঠে আসেন স্বল্প বস্র পরিহিত অবস্থায়। নবী মুখ ফিরিয়ে নেন এবং অস্পষ্টভাবে কিছু বলতে বলতে চলে যান। শুধু বোঝা যায়: “سبحان الله العظيم، سبحان مصرف القلوب” (মহান আল্লাহ পবিত্র, অন্তর যিনি ঘোরান তিনি পবিত্র)। জায়েদ ফিরে এসে ঘটনা শোনেন, নবীর কাছে গিয়ে বলেন, আপনার পছন্দ হলে আমি জয়নাবকে তালাক দেব। নবী বলেন “أمسك عليك زوجك” (তোমার স্ত্রীকে রেখে দাও)। এরপর যায়েদ আর স্বাভাবিকভাবে স্ত্রীর কাছে যেতে পারেননি, এবং শেষে তালাক দেন।
ঠিক তখনই নাজিল হয় (সূরা আহযাব ৩৩:৩৭) “আর স্মরণ করুন, আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন এবং আপনিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, আপনি তাকে বলছিলেন, ‘তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছেই রাখো এবং আল্লাহকে ভয় করো।’ আর আপনি আপনার অন্তরে যা লুকিয়ে রাখছিলেন (জয়নাবকে বিয়ে করার ইচ্ছা), যা আল্লাহ প্রকাশ করতে চান এবং আপনি মানুষকে ভয় করছিলেন, অথচ আল্লাহই বেশি হকদার যে, আপনি তাঁকে ভয় করবেন। অতঃপর যখন জায়েদ তার স্ত্রীকে তালাক দিল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলাম, যাতে মুমিনদের পালিত পুত্ররা তাদের স্ত্রীদের তালাক দিলে সেই স্ত্রীদের বিয়ে করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা না থাকে। আর আল্লাহর নির্দেশ কার্যকর হয়েই থাকে।
এটাকে কি নাজিল বলা যায়, নাকি জয়নাবকে বিয়ে করার জন্য আয়াত রচনা করা হয়েছে? তাবারীর তাফসীর (সূরা আহযাব ৩৩:৩৭), আবদুর রহমান ইবনে জায়েদ ইবনে আসলামের নিজের বক্তব্য: নবী যায়েদের খোঁজে যান। দরজায় পশমের একটি পর্দা ছিল। বাতাসে পর্দা সরে যায়, আর যায়নাব ঘরের ভেতরে অনাবৃত (حاسرة) অবস্থায় ছিলেন। নবীর অন্তরে তাঁর প্রতি মুগ্ধতা জন্মায়, আর সেই থেকে জায়েদের কাছে তিনি অপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
একটা প্রশ্ন, আল্লাহ যদি সবকিছু জানে, তাহলে একবার আয়াত নামিয়ে জায়েদের সাথে বিয়ে, আবার আয়াত নামিয়ে মুহাম্মদের সাথে বিয়ে দেয়ার যৌক্তিকতা কি? ধরে নিলাম মুহাম্মদ জায়েদ-জয়নাবের বিয়ে ভাঙ্গে নাই, তাহলে আল্লাহ ও রাসূলের ফয়সালা ভুল কিভাবে হলো, যখন জায়েদ-জয়নাবের বিয়ের জন্য কুরআন ৩৩:৩৬ নাজিল হলো? ঠিক পরের আয়াতে, মুহাম্মদ আর জয়নাবের বিয়ের বাদ্য বেজে উঠল, বাহ কি চমৎকার।
মুহাম্মদ-জয়নাবের বিয়ে: একটি মানবিক নিয়মের মৃত্যু
আরব সমাজে পালকপুত্রকে ঔরসজাত পুত্রের সমান মনে করা হতো, ফলে পালকপুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে করা ছিল নিষিদ্ধ ও লজ্জাজনক। লেখার উপরের অংশে, মুহাম্মদ ও জায়েদের বাবা-ছেলের সুসম্পর্কের স্পষ্ট প্রমাণ পাও যায়। শুধুমাত্র নারী আসক্তির কারণে মুহাম্মদ দত্তক প্রথার মতো একটি মানবিক কাজকে নিষিদ্ধ করে গেছে।
কুরআন ৩৩:৩৭ এই বিবাহকে সরাসরি আল্লাহর নির্দেশ হিসেবে উপস্থাপন করে: “আমি তাকে তোমার সঙ্গে বিয়ে দিলাম, যাতে মুমিনদের জন্য তাদের পালকপুত্রদের স্ত্রীদের বিষয়ে কোনো অসুবিধা না থাকে।” একই সঙ্গে আয়াতটি বলে: “তুমি তোমার মনে এমন কিছু গোপন রাখছিলে যা আল্লাহ প্রকাশ করে দেবেন, এবং তুমি মানুষকে ভয় করছিলে, অথচ আল্লাহই অধিক যোগ্য যে তুমি তাঁকে ভয় করো।” এর পরপরই পালকপুত্র প্রথা বাতিল করা হয় এবং ঘোষণা করা হয় যে মুহাম্মদ কোনো পুরুষের পিতা নন (৩৩:৪, ৩৩:৪০)। যায়েদ, যিনি এতদিন “জায়েদ ইবনে মুহাম্মদ” নামে পরিচিত ছিলেন, তিনি আবার “জায়েদ ইবনে হারিসা” হয়ে যান।
সহিহ বুখারিতে (৭৪২০) আনাস বর্ণনা করেন, এই আয়াত জায়েদ ও জয়নাব প্রসঙ্গে নাজিল হয়েছে। এবং সহিহ মুসলিম (১৭৭) ও অন্যান্য বর্ণনায় আয়েশার উক্তি পাওয়া যায় যে, নবী যদি ওহির কোনো অংশ গোপন করতেন, তবে এই আয়াতটিই গোপন করতেন। অর্থাৎ নবীর নিকটতম মানুষদের কাছেও ঘটনাটি অস্বস্তিকর মনে হয়েছিল।
আধুনিক শিশু কল্যাণ আইনে দত্তক একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা ব্যবস্থা, এবং CRC-এর অনুচ্ছেদ ২০–২১ পরিবারহীন শিশুর বিকল্প পরিচর্যার কথা বলে। একজন ব্যক্তির বিবাহের প্রয়োজনে একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানের চিরস্থায়ী বিলোপ, ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিতে, ব্যক্তিগত স্বার্থ ও সর্বজনীন আইনপ্রণয়নের মধ্যে সীমারেখা মুছে যাওয়ার আরেকটি উদাহরণ।
যুদ্ধবন্দি নারী
কুরআন ৪:২৩–২৪ আয়াতে যেসব নারীকে বিবাহ করা নিষিদ্ধ তাদের তালিকা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে বিবাহিত নারীরাও রয়েছে: “এবং নারীদের মধ্যে যারা বিবাহিত, তারাও (নিষিদ্ধ), তবে তোমাদের ডান হাত যাদের মালিক হয়েছে (মা মালাকাত আয়মানুকুম) তারা ব্যতীত।”
এই আয়াতের নাজিলের প্রেক্ষাপট সহিহ মুসলিমে (১৪৫৬) আবু সাঈদ খুদরি বর্ণনা করেছেন: হুনাইন যুদ্ধের সময় আওতাসে মুসলিম বাহিনী শত্রুপক্ষকে পরাজিত করে বন্দিনী গ্রহণ করে। কিছু সাহাবি এই বন্দিনীদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে দ্বিধা বোধ করছিলেন, কারণ তাদের মুশরিক স্বামীরা তখনো জীবিত ছিল। তখন আল্লাহ এই আয়াত নাজিল করেন, অর্থাৎ ইদ্দত শেষ হলে তারা তোমাদের জন্য বৈধ।
সুনানে আবু দাউদে (২১৫৭) নবীর নির্দেশ উদ্ধৃত আছে: গর্ভবতী বন্দিনীর সঙ্গে সন্তান প্রসবের আগে এবং অন্যদের সঙ্গে একটি ঋতুস্রাব অতিক্রান্ত হওয়ার আগে সহবাস করা যাবে না (ইস্তিবরা)। এই নির্দেশের উদ্দেশ্য গর্ভের পিতৃত্ব নির্ধারণ; বন্দিনীর সম্মতি এই শর্তের অংশ নয়।
এখানে লক্ষণীয় যে, সাহাবিদের মধ্যেই একটি স্বাভাবিক নৈতিক দ্বিধা কাজ করছিল: জীবিত স্বামী আছে এমন নারীর সঙ্গে সম্পর্ক কি অন্যায় নয়? এবং সেই দ্বিধা দূর করা হয় ঐশী অনুমোদনের মাধ্যমে। একজন ধর্মনিরপেক্ষ পাঠকের কাছে এটি নৈতিক উন্নয়নের বিপরীত দিকের দৃষ্টান্ত: মানুষের বিবেক যেখানে থামতে চাইছিল, ধর্মীয় বিধান সেখানে এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিল।
বনু মুস্তালিক ও আজল
সহিহ বুখারিতে (৪১৩৮; আরও দেখুন ২৫৪২) আবু সাঈদ খুদরি বলেন: আমরা নবীর সঙ্গে বনু মুস্তালিকের যুদ্ধে গিয়েছিলাম এবং আরব বন্দিনী পেয়েছিলাম। আমাদের নারীসঙ্গের আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়েছিল, এবং আমরা আজল (বীর্যপাতের আগে প্রত্যাহার) করতে চাইছিলাম। আমরা নবীকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, তোমরা এটি না করলে কোনো ক্ষতি নেই, কারণ কিয়ামত পর্যন্ত যে প্রাণ অস্তিত্বে আসার তা আসবেই।
এই বর্ণনার অন্য সংস্করণে স্পষ্ট করা হয়েছে যে আজলের কারণ ছিল মুক্তিপণ: বন্দিনী গর্ভবতী হলে তাকে বিক্রি বা মুক্তিপণের বিনিময়ে ফেরত দেওয়া কঠিন হতো। নবীর উত্তরে আজলের প্রশ্নটির আলোচনা আছে, কিন্তু বন্দিনীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের প্রশ্নটি কোনো আপত্তির বিষয় হিসেবে উঠে আসেনি। আলোচনাটি ধর্মতাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক; নারীদের সম্মতি, মানসিক অবস্থা বা মানবিক মর্যাদা এখানে অনুপস্থিত। মনে রাখা প্রয়োজন, এই নারীরা কয়েক ঘণ্টা বা দিন আগে নিজেদের স্বামী, পিতা ও ভাইদের নিহত হতে দেখেছেন (বুখারি ২৫৪১ অনুযায়ী আক্রমণটি হয়েছিল অপ্রস্তুত অবস্থায়, যখন তাঁরা পশুদের পানি পান করাচ্ছিলেন)।
জুওয়াইরিয়া বিনতে হারিস
এই একই অভিযানে বনু মুস্তালিক গোত্রপ্রধান হারিসের কন্যা জুওয়াইরিয়া বন্দি হন (বুখারি ২৫৪১)। সুনানে আবু দাউদ (৩৯৩১) ও ইবনে হিশামের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি সাবিত ইবনে কায়সের ভাগে পড়েন, মুক্তির জন্য চুক্তি (মুকাতাবা) করেন এবং সাহায্য চাইতে নবীর কাছে আসেন। নবী প্রস্তাব দেন যে তিনি তাঁর মুক্তিপণ পরিশোধ করে তাঁকে বিয়ে করবেন; জুওয়াইরিয়া রাজি হন। এরপর সাহাবিরা নবীর আত্মীয়তার সম্মানে বনু মুস্তালিকের বহু বন্দিকে মুক্ত করে দেন।
আপোলজেটিক সাহিত্যে এই ঘটনাকে নবীর দূরদর্শিতা ও দয়ার উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, এবং এর ফলে অনেক বন্দির মুক্তি সত্যিই ঘটেছিল। তবে আধুনিক আইনি দৃষ্টিতে প্রশ্ন থেকে যায়: যে নারীর গোত্রকে সদ্য পরাজিত করা হয়েছে, যিনি নিজে দাসত্বে আছেন, এবং যাঁর সামনে বিকল্প হলো অন্য একজনের দাসী থাকা, তাঁর “সম্মতি” কি স্বাধীন সম্মতি? আন্তর্জাতিক আইনে “স্বাধীন ও পূর্ণ সম্মতি”র পূর্বশর্ত হলো জোর, হুমকি বা বলপ্রয়োগমূলক পরিস্থিতির অনুপস্থিতি।
সাফিয়া বিনতে হুয়াই
সাফিয়ার ঘটনাটি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি আলোচিত। সহিহ বুখারির একাধিক বর্ণনা (৩৭১, ৪২০০, ৪২১১, ৫০৮৫) এবং সহিহ মুসলিম (১৩৬৫) থেকে নিম্নলিখিত তথ্য প্রতিষ্ঠিত: খায়বার অভিযানে মুসলিম বাহিনী ইহুদি বসতি জয় করে, যোদ্ধাদের হত্যা করে এবং নারী ও শিশুদের বন্দি করে। দিহইয়া আল-কালবি নবীর কাছে একজন দাসী চাইলে নবী তাঁকে একজন বেছে নিতে বলেন; তিনি সাফিয়াকে নেন। একজন সাহাবি নবীকে বলেন যে সাফিয়া বনু কুরাইজা ও বনু নাদিরের নেত্রী, তিনি কেবল আপনারই উপযুক্ত। নবী দিহইয়াকে সাফিয়াসহ ডেকে পাঠান, সাফিয়াকে নিজের জন্য নেন এবং দিহইয়াকে অন্য একজন বন্দিনী নিতে বলেন। নবী সাফিয়াকে মুক্ত করেন এবং মুক্তিকেই তাঁর মোহরানা নির্ধারণ করেন। খায়বার থেকে মদিনায় ফেরার পথে, সাদ্দুস সাহবা নামক স্থানে, তাঁর ঋতুস্রাব শেষ হলে দাম্পত্য সম্পন্ন হয়; এক বর্ণনায় আছে যে পথে তিন রাত যাত্রাবিরতি দেওয়া হয়।
ইবনে হিশামের সিরাত অনুযায়ী সাফিয়ার স্বামী কিনানা ইবনে রাবিকে লুকানো সম্পদের সন্ধান আদায়ের জন্য নির্যাতন করা হয় এবং পরে হত্যা করা হয়; সাফিয়ার পিতা হুয়াই ইবনে আখতাব আগেই বনু কুরাইজার সঙ্গে নিহত হয়েছিলেন।
সময়রেখাটি বিবেচনা করুন: একজন তরুণী, যাঁর বয়স উৎস অনুযায়ী সতেরো বছরের কাছাকাছি, একই সপ্তাহে তাঁর সম্প্রদায় পরাজিত হয়েছে, স্বামী নিহত হয়েছেন, তিনি নিজে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে প্রথমে একজন সৈনিককে এবং পরে সেনাপতিকে বরাদ্দ হয়েছেন, এবং ফেরার পথেই তাঁর সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। মুসলিম ঐতিহ্যে বলা হয় যে সাফিয়া স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ ও বিবাহে সম্মত হয়েছিলেন, এবং পরবর্তী জীবনে তিনি নবীর প্রতি অনুগত ছিলেন। হতে পারে। কিন্তু আধুনিক আইনের প্রশ্নটি সহজ: এই পরিস্থিতিতে কোনো সম্মতিকে কি আইনত গ্রহণযোগ্য বলা যায়?
রায়হানা ও বনু কুরাইজা
ইবনে ইসহাক ও ইবনে সাদের বর্ণনা অনুযায়ী খন্দক যুদ্ধের পর বনু কুরাইজা আত্মসমর্পণ করলে তাদের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের (উৎসভেদে ৪০০ থেকে ৯০০ জন) হত্যা করা হয় এবং নারী ও শিশুদের দাস হিসেবে বণ্টন করা হয়। পুরুষদের হত্যার মূল তথ্য সহিহ বুখারিতেও (৪১২১, ৩০৪৩) রয়েছে। বন্দিনীদের মধ্য থেকে রায়হানা বিনতে যায়েদকে নবী নিজের জন্য বেছে নেন। কোনো বর্ণনায় তিনি মুক্ত হয়ে স্ত্রী হন, কোনো বর্ণনায় তিনি দাসী হিসেবেই থাকেন এবং স্বেচ্ছায় সেটিই বেছে নেন।
আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে
আধুনিক আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইন এই বিষয়ে দ্ব্যর্থহীন:
চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন (১৯৪৯), অনুচ্ছেদ ২৭: নারীদের তাদের সম্মানের ওপর যেকোনো আক্রমণ, বিশেষত ধর্ষণ, জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তি বা যেকোনো ধরনের অশালীন আক্রমণ থেকে বিশেষভাবে রক্ষা করতে হবে।
রোম সংবিধি (১৯৯৮), অনুচ্ছেদ ৭(১)(ছ) ও ৮(২)(খ)(xxii): ধর্ষণ, যৌন দাসত্ব, জোরপূর্বক গর্ভধারণ এবং সমমাত্রার অন্যান্য যৌন সহিংসতা যথাক্রমে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ। অনুচ্ছেদ ৭(১)(গ) দাসত্বকে (enslavement) মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে।
Prosecutor v. Kunarac et al. (ICTY, ২০০১–২০০২): সাবেক যুগোস্লাভিয়ার জন্য আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল বসনিয়ার ফোচায় বন্দি নারীদের আটকে রেখে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকে ধর্ষণ ও দাসত্ব হিসেবে সাজা দেয়। রায়ে প্রতিষ্ঠিত হয় যে বন্দিত্বের মতো স্বভাবগতভাবে বলপ্রয়োগমূলক পরিস্থিতিতে প্রকৃত সম্মতি সম্ভব নয়, এবং নারীদের ওপর মালিকানাসুলভ ক্ষমতা প্রয়োগই দাসত্বের মূল উপাদান।
এই মানদণ্ডে বিচার করলে, যুদ্ধে পরাজিত সম্প্রদায়ের নারীদের সৈন্যদের মধ্যে বণ্টন এবং তাদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন, তা বিবাহের আকারে হোক বা দাসীত্বের আকারে, আজ আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারযোগ্য অপরাধ। বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা এই মূল্যায়ন বদলায় না: ICC ডমিনিক অনগোয়েন মামলায় (২০২১) “জোরপূর্বক বিবাহ”কে আলাদাভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে সাজা দিয়েছে।
দাসী ও “মা মালাকাত আয়মানুকুম”
কুরআনে “মা মালাকাত আয়মানুকুম” (তোমাদের ডান হাত যাদের মালিক) শব্দবন্ধ প্রায় পনেরোবার এসেছে। যৌন সম্পর্কের বৈধতা প্রসঙ্গে সবচেয়ে স্পষ্ট আয়াত দুটি প্রায় অভিন্ন ভাষায় দুই সূরায় রয়েছে:
“এবং যারা নিজেদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে, তবে নিজেদের স্ত্রী অথবা তাদের ডান হাত যাদের মালিক, তাদের ক্ষেত্রে ব্যতীত; এতে তারা নিন্দনীয় নয়।” (কুরআন ২৩:৫–৬; ৭০:২৯–৩০)
এখানে দাসীকে স্ত্রীর পাশাপাশি একটি আলাদা বৈধ যৌনসঙ্গী শ্রেণি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআন ৪:৩ স্ত্রীর সংখ্যা চারে সীমিত করলেও দাসীর সংখ্যায় কোনো সীমা আরোপ করেনি, এবং ক্লাসিক্যাল ফিকহে সর্বসম্মতভাবে এটিই গৃহীত হয়েছে। ক্লাসিক্যাল ফিকহ অনুযায়ী মালিক ও দাসীর সম্পর্কের জন্য বিবাহ, মোহরানা বা দাসীর সম্মতির প্রয়োজন নেই; মালিকানাই (মিলকুল ইয়ামিন) বৈধতার ভিত্তি। নবীর ক্ষেত্রে কুরআন ৩৩:৫০ স্পষ্টভাবে যুদ্ধলব্ধ দাসীদের (“যাদের আল্লাহ তোমাকে ফাই হিসেবে দিয়েছেন”) বৈধ বলেছে, এবং ৩৩:৫২ যেখানে নতুন স্ত্রী গ্রহণ নিষিদ্ধ করেছে, সেখানেও “তোমার ডান হাত যাদের মালিক” তাদের ব্যতিক্রম রেখেছে।
মারিয়া আল-কিবতিয়া
মিশরের বাইজেন্টাইন শাসক মুকাওকিস নবীর চিঠির জবাবে উপহার হিসেবে দুজন দাসী পাঠান: মারিয়া ও তাঁর বোন সিরিন। নবী মারিয়াকে নিজের জন্য রাখেন এবং সিরিনকে কবি হাসসান ইবনে সাবিতকে দেন। মারিয়ার গর্ভে নবীর পুত্র ইবরাহিম জন্মগ্রহণ করে এবং শৈশবেই মারা যায়। অধিকাংশ উৎস অনুযায়ী মারিয়ার সঙ্গে নবীর কোনো আনুষ্ঠানিক বিবাহ হয়নি; তিনি উম্মে ওয়ালাদ (মালিকের সন্তানের মা) হিসেবে বিবেচিত ছিলেন।
সূরা তাহরিমের প্রথম আয়াত (“হে নবী, আল্লাহ যা তোমার জন্য বৈধ করেছেন, তুমি তা নিজের জন্য নিষিদ্ধ করছ কেন, তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টির জন্য?”) সুনানে নাসাঈর (৩৯৫৯) বর্ণনায়, এবং তাবারির তাফসিরে বেশ কিছু বর্ণনায় বলা হয়েছে যে নবীর একজন দাসী ছিল যার সঙ্গে তিনি শারীরিক সম্পর্ক রাখতেন, এবং আয়েশা ও হাফসার চাপে তিনি তাকে নিজের জন্য নিষিদ্ধ করেন। তাবারির বর্ণনায় এটি হাফসার ঘরে মারিয়ার সঙ্গে ঘটেছিল বলে উল্লেখ আছে।
উপহার হিসেবে প্রাপ্ত একজন মানুষ, যাঁর নিজের মতামত কোনো উৎসে সংরক্ষিত হয়নি, একজন শাসকের যৌনসঙ্গী হয়েছিলেন। আধুনিক আইনে কোনো মানুষকে উপহার হিসেবে দেওয়া বা গ্রহণ করাই মানবপাচার (UN Palermo Protocol, ২০০০) এবং দাসত্ব (দাসপ্রথা সনদ, ১৯২৬, অনুচ্ছেদ ১: কোনো ব্যক্তির ওপর মালিকানার অধিকারসংশ্লিষ্ট যেকোনো ক্ষমতার প্রয়োগ)।
ইসলামে দাসপ্রথা: নিয়ন্ত্রণ, নাকি বিলোপ?
মুসলিম পণ্ডিতদের একটি শক্তিশালী যুক্তি হলো, ইসলাম দাসপ্রথার উদ্ভাবক নয়; বরং এটি একটি সর্বজনীন প্রাচীন প্রথাকে সংস্কার করেছে এবং ধাপে ধাপে বিলোপের পথ খুলে দিয়েছে। এর পক্ষে প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়: দাসমুক্তিকে বিভিন্ন পাপের কাফফারা নির্ধারণ (৪:৯২, ৫:৮৯, ৫৮:৩), জাকাতের একটি খাত দাসমুক্তির জন্য নির্ধারণ (৯:৬০), মুক্তিচুক্তির (মুকাতাবা) নির্দেশ (২৪:৩৩), দাসদের সঙ্গে সদাচরণের হাদিস, এবং উম্মে ওয়ালাদের মালিকের মৃত্যুর পর স্বয়ংক্রিয় মুক্তি। এই সংস্কারগুলো বাস্তব, এবং তৎকালীন রোমান বা পারস্য দাসপ্রথার তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে মানবিক ছিল, এটি সততার সঙ্গে স্বীকার করা উচিত।
তবে এই যুক্তির বিরুদ্ধে কয়েকটি গুরুতর আপত্তি আছে, নবী নিজে দাস রাখতেন, কিনতেন, বিক্রি করতেন ও উপহার দিতেন। ইবনুল কাইয়িম তাঁর যাদুল মাআদ গ্রন্থে নবীর মালিকানাধীন দাস-দাসীর দীর্ঘ তালিকা দিয়েছেন। সহিহ মুসলিমে (১৬০২) নবী একজন দাসকে দুজন কৃষ্ণাঙ্গ দাসের বিনিময়ে কেনেন। যিনি দাসপ্রথা বিলোপের লক্ষ্যে কাজ করছেন, তাঁর নিজের আচরণে সেই লক্ষ্য প্রতিফলিত হওয়ার কথা।
যুদ্ধের মাধ্যমে নতুন দাস তৈরির পথ খোলা রাখা হয়েছিল। প্রকৃত বিলোপের পথে প্রথম পদক্ষেপ হতো নতুন দাস সংগ্রহ বন্ধ করা। কিন্তু বন্দিদের দাস বানানোর বিকল্পটি ক্লাসিক্যাল ফিকহে শাসকের বৈধ ক্ষমতা হিসেবে স্থায়ী রয়ে যায়, এবং পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে ইসলামি সাম্রাজ্যগুলোতে বৃহৎ দাস-বাণিজ্য গড়ে ওঠে।
ক্রমান্বয়ের যুক্তি মদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলে দাসপ্রথার ক্ষেত্রে নয় কেন? আপোলজেটিক সাহিত্যে বলা হয় মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল ধাপে ধাপে, তেইশ বছরের মধ্যে। তাহলে একই সময়সীমায় দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করা হয়নি কেন? “নবুওয়াত শেষ হয়ে গেছে” (৩৩:৪০) হওয়ার পর আর কোনো ঐশী ধাপ বাকি থাকে না।
বিলোপ এসেছে বাইরে থেকে। মুসলিম বিশ্বে দাসপ্রথার আনুষ্ঠানিক বিলোপ মূলত ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক ও আন্তর্জাতিক চাপে ঘটে: সৌদি আরব ও ইয়েমেন ১৯৬২ সালে, ওমান ১৯৭০ সালে, মৌরিতানিয়া ১৯৮১ সালে (অপরাধ হিসেবে ঘোষণা ২০০৭ সালে)। বহু আলেম তখন এই বিলোপকে শরিয়াহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বিরোধিতা করেছিলেন।
এর সবচেয়ে ভয়াবহ আধুনিক পরিণতি দেখা গেছে ২০১৪ সালে। ইসলামিক স্টেট (আইএস) ইরাকের সিনজারে ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের ওপর গণহত্যা চালিয়ে হাজার হাজার নারী ও মেয়েশিশুকে যৌন দাসী বানায়। আইএস তাদের মুখপত্র দাবিক-এর চতুর্থ সংখ্যায় (“কিয়ামতের আগে দাসপ্রথার পুনরুজ্জীবন”) এবং একটি ফতোয়া-পুস্তিকায় সরাসরি কুরআন ২৩:৬, ৪:২৪ এবং আওতাস ও বনু মুস্তালিকের হাদিস উদ্ধৃত করে এই কর্মকাণ্ডের বৈধতা দাবি করে। আইএস যে পাঠ্য উদ্ধৃত করেছিল তা কি বানোয়াট ছিল? উত্তর হলো, না। তাদের ব্যাখ্যা ক্লাসিক্যাল ফিকহ থেকে খুব দূরে ছিল না। জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন ২০১৬ সালে ইয়াজিদিদের ওপর আইএসের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করে। যে পাঠ্য এমন কর্মকাণ্ডের জন্য উদ্ধৃতিযোগ্য থাকে, তা সর্বকালীন নৈতিক নির্দেশিকা হিসেবে কতটা নিরাপদ, এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
নারী বিষয়ক বৃহত্তর কাঠামো
নবীর ব্যক্তিগত বৈবাহিক জীবন একটি বৃহত্তর আইনি ও ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোর অংশ, যেখানে নারীর অবস্থান কাঠামোগতভাবে পুরুষের অধীন। সংক্ষেপে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বিধান:
কর্তৃত্ব ও প্রহার: “পুরুষ নারীর ওপর কর্তৃত্বশীল (কাওয়ামুন)… আর যাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা করো, তাদের উপদেশ দাও, শয্যা পৃথক করো এবং প্রহার করো” (৪:৩৪)। আধুনিক ব্যাখ্যাকাররা “প্রহার” শব্দের অর্থ নরম করার চেষ্টা করলেও ক্লাসিক্যাল তাফসিরে এর আক্ষরিক অর্থই গৃহীত।
সাক্ষ্য: আর্থিক লেনদেনে দুজন নারীর সাক্ষ্য একজন পুরুষের সমান (২:২৮২)। সহিহ বুখারিতে (৩০৪) নবী এর কারণ ব্যাখ্যা করেছেন নারীর “বুদ্ধির ঘাটতি” দিয়ে, এবং একই হাদিসে ঋতুকালে নামাজ-রোজা না করাকে “ধর্মের ঘাটতি” বলেছেন।
উত্তরাধিকার: পুত্র কন্যার দ্বিগুণ অংশ পায় (৪:১১)।
জাহান্নাম: নবী জাহান্নামে অধিকাংশ বাসিন্দা নারী দেখেছেন, কারণ তারা স্বামীর প্রতি অকৃতজ্ঞ (বুখারি ২৯, ৩০৪)।
তালাক ও বহুবিবাহ: পুরুষ একতরফাভাবে তালাক দিতে পারে এবং চারজন স্ত্রী রাখতে পারে; নারীর এই অধিকার নেই।
CEDAW-এর অনুচ্ছেদ ২ ও ১৬ বিবাহ, পারিবারিক সম্পর্ক ও উত্তরাধিকারে নারী-পুরুষের সমান অধিকার দাবি করে। বাংলাদেশসহ বহু মুসলিম রাষ্ট্র ঠিক এই অনুচ্ছেদগুলোতে “শরিয়াহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক” হওয়ার কারণে সংরক্ষণ দিয়েছে। এই সংরক্ষণগুলো নিজেই সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ যে ঐতিহ্যগত ইসলামি পারিবারিক আইন এবং আধুনিক নারী-অধিকার মানদণ্ডের মধ্যে সংঘাতটি কাল্পনিক নয়, এবং তা রাষ্ট্রীয় পর্যায়েই স্বীকৃত।
সর্বজনীনতার দাবি ও নৈতিক আপেক্ষিকতার দ্বিধা
এই প্রবন্ধে আলোচিত প্রায় প্রতিটি বিষয়ে মুসলিম আপোলজেটিক্সের কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা হলো ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: সেই যুগে এটিই স্বাভাবিক ছিল। এই প্রতিরক্ষা একটি যৌক্তিক দ্বিধার (dilemma) জন্ম দেয়, যা নিম্নরূপে উপস্থাপন করা যায়:
প্রথম বিকল্প: মুহাম্মদের আচরণ তাঁর যুগের মানদণ্ডে বিচার্য, কারণ নৈতিক মানদণ্ড কালের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। সেক্ষেত্রে তাঁর আচরণ সর্বকালের জন্য আদর্শ হতে পারে না; সপ্তম শতাব্দীর আরবের জন্য গ্রহণযোগ্য আচরণ একবিংশ শতাব্দীতে অনুসরণীয় নয়। এতে ৩৩:২১ ও ২১:১০৭-এর সর্বজনীন দাবি দুর্বল হয়ে পড়ে, এবং শরিয়াহর চিরন্তনতার দাবিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
দ্বিতীয় বিকল্প: মুহাম্মদের আচরণ চিরন্তন ও সর্বজনীন আদর্শ। সেক্ষেত্রে ছয় বছরের মেয়ের বিবাহ, যুদ্ধবন্দিনীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক এবং দাসী রাখা আজও নৈতিকভাবে অনুকরণযোগ্য হতে হবে। অথচ আজকের অধিকাংশ মুসলিম, আলেম ও মুসলিম রাষ্ট্র নিজেরাই এই আচরণগুলো আইনত নিষিদ্ধ করেছে বা নৈতিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে।
আপোলজেটিক্স সাধারণত দুটি বিকল্প মিশিয়ে ফেলে: সমালোচনার সময় প্রথম বিকল্প (ঐতিহাসিক আপেক্ষিকতা), আর প্রচারের সময় দ্বিতীয় বিকল্প (চিরন্তন আদর্শ)। এটি যুক্তিবিদ্যায় “মট অ্যান্ড বেইলি” (motte-and-bailey) কৌশল নামে পরিচিত। আরও লক্ষণীয় যে, ঐতিহাসিক আপেক্ষিকতার যুক্তিটি মূলত একটি ধর্মনিরপেক্ষ যুক্তি; এটি নৈতিকতাকে সামাজিক বিবর্তনের ফল হিসেবে দেখে। একজন বিশ্বাসী যখন এই যুক্তি ব্যবহার করেন, তখন তিনি অজান্তেই স্বীকার করে নেন যে মানবসমাজ ধর্মীয় উৎসের বাইরে থেকে নৈতিক উন্নতি অর্জন করেছে, এবং সেই উন্নত মানদণ্ড দিয়েই তিনি ধর্মীয় উৎসের কিছু অংশকে “সেকালের জন্য” বলে সীমাবদ্ধ করছেন। অর্থাৎ নৈতিক কর্তৃত্ব কার্যত আধুনিক মানবিক বিবেকের হাতেই চলে যায়।
এছাড়া “সেকালে এটাই স্বাভাবিক ছিল” দাবিটিও আংশিক। সেই একই যুগে সাহাবিদের মধ্যে আওতাসের বন্দিনীদের নিয়ে দ্বিধা ছিল (সহিহ মুসলিম ১৪৫৬); জয়নাবের ঘটনায় সামাজিক অস্বস্তি ছিল বলেই কুরআনকে বিশেষভাবে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে; আয়েশা নিজেই নবীর বিশেষ সুবিধা নিয়ে কটাক্ষ করেছেন; আর নাবালিকা বিবাহের বিরুদ্ধে ইবনে শুবরুমার মত ছিল। নৈতিক অস্বস্তি সেই যুগেও অনুভূত হয়েছিল; কিন্তু প্রতিবারই ঐশী অনুমোদন সেই অস্বস্তিকে দমন করেছে।
একজন নবীর কাছ থেকে প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই একজন সাধারণ গোত্রপ্রধানের চেয়ে বেশি। যদি সর্বজ্ঞ স্রষ্টা মানবজাতির জন্য শেষ ও পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা পাঠান, তবে সেই নির্দেশনায় “কোনো মানুষ অন্য মানুষের মালিক হতে পারে না” বা “শিশুকে বিয়ে দেওয়া যাবে না” এমন একটি স্পষ্ট বাক্যের অনুপস্থিতি ব্যাখ্যা দাবি করে, বিশেষত যখন একই গ্রন্থ শূকরের মাংস বা সুদের মতো বিষয়ে দ্ব্যর্থহীন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
উপসংহার
এই প্রবন্ধে মুসলিম ঐতিহ্যের নিজস্ব সর্বাধিক প্রামাণ্য উৎস থেকে দেখানো হয়েছে যে নবী মুহাম্মদের বৈবাহিক ও যৌন জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, বিশেষত ছয় বছর বয়সে আয়েশার সঙ্গে বিবাহ ও নয় বছর বয়সে দাম্পত্য, যুদ্ধে স্বজনহারা বন্দিনী নারীদের গ্রহণ, এবং দাসীদের সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ক, আধুনিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, শিশু অধিকার আইন ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক। আজকের আইনে এসব কর্মকাণ্ড শিশু যৌন নির্যাতন, যৌন দাসত্ব ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞায় পড়ে।
প্রবন্ধটি এও দেখিয়েছে যে নবীর জন্য কুরআনে একাধিক বিশেষ ছাড় নির্ধারিত হয়েছিল, যা সাধারণ মুসলিমদের জন্য প্রযোজ্য ছিল না, এবং এসব ছাড় বারবার তাঁর ব্যক্তিগত ইচ্ছার অনুকূলে এসেছে, যা তাঁর নিজের স্ত্রী আয়েশার পর্যবেক্ষণেও ধরা পড়েছে। আধুনিক শাসনতত্ত্বের ভাষায় এটি স্বার্থের সংঘাতের একটি ধ্রুপদি উদাহরণ।
যদি কোনো ব্যক্তিকে সর্বকালের সব মানুষের জন্য অনুসরণীয় নৈতিক আদর্শ হিসেবে দাবি করা হয়, তবে সর্বকালের নৈতিক মানদণ্ডে তাঁকে পরীক্ষার দায়ও সেই দাবিরই অংশ। বাস্তবে আধুনিক মুসলিম সমাজগুলো নিজেরাই বাল্যবিবাহ, দাসপ্রথা ও যুদ্ধবন্দিনীর যৌন ব্যবহার আইনত নিষিদ্ধ করে এই মূল্যায়নের সঙ্গে কার্যত একমত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এই ব্যবহারিক স্বীকৃতিকে কি একটি সৎ ধর্মতাত্ত্বিক পুনর্মূল্যায়নে রূপান্তরিত করা হবে, নাকি সর্বজনীনতার দাবি এবং আধুনিক বিবেকের মধ্যকার ফাঁকটি অস্বীকারের মাধ্যমে ঢেকে রাখা হবে। শিশু, নারী ও দুর্বলতম মানুষদের নিরাপত্তার স্বার্থে এই প্রশ্নটি প্রকাশ্যে, যুক্তিনিষ্ঠভাবে ও পারস্পরিক সম্মানের সঙ্গে আলোচিত হওয়া প্রয়োজন।

Leave a Reply