মুহাম্মদ যেভাবে তার সমালোচকদের হত্যা করেছে

ইসলামকে প্রায়ই “শান্তির ধর্ম” বলা হয়। মুহাম্মদকে বলা হয় “রহমাতুল্লিল আলামিন” বিশ্বজগতের জন্য করুণা (কুরআন ২১:১০৭) এবং মানবজাতির জন্য “উসওয়াতুন হাসানা” বা সর্বোত্তম আদর্শ (কুরআন ৩৩:২১)। কিন্তু ইসলামের নিজস্ব প্রাথমিক উৎসগুলো, সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, ইবনে ইসহাকের সিরাত, ওয়াকিদির কিতাবুল মাগাজি, ইবনে সা’দের তাবাকাত এবং তাবারির ইতিহাস ভিন্ন এক চিত্র তুলে ধরে। এসব গ্রন্থে অন্তত পাঁচজন মানুষের হত্যার বর্ণনা আছে, যাদের প্রধান অপরাধ ছিল কথায় বা কবিতায় মুহাম্মদের সমালোচনা। তারা নিহত হয়েছেন হয় মুহাম্মদের সরাসরি আহ্বানে, নয়তো তার পরবর্তী অনুমোদনে।

নিহতদের মধ্যে আছেন একজন অতিবৃদ্ধ কবি, সন্তানদের পাশে ঘুমন্ত এক মা এবং এক অন্ধ ব্যক্তির গর্ভবতী দাসী। হত্যার পদ্ধতি ছিল ছলনা, বন্ধুত্বের ভান আর রাতের অন্ধকারে গোপন আক্রমণ। কোনো ক্ষেত্রেই অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি।

আবু আফাক: ঘুমন্ত বৃদ্ধ কবি

আবু আফাক ছিলেন মদিনার বনু আমর ইবনে আওফ গোত্রের এক অতিবৃদ্ধ কবি; ওয়াকিদি ও ইবনে সা’দ তাকে ইহুদি এবং ১২০ বছর বয়সী বলে উল্লেখ করেছেন। তার অপরাধ ছিল ব্যঙ্গাত্মক কবিতা, যেখানে তিনি মদিনাবাসীকে এক বহিরাগতের কথায় নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হওয়ার জন্য তিরস্কার করেছিলেন।

ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় মুহাম্মদ বলেন, “কে আমার হয়ে এই দুর্বৃত্তের ব্যবস্থা করবে?” সালিম ইবনে উমাইর নামে এক সাহাবি দায়িত্ব নেন। ইবনে সা’দের বর্ণনা অনুযায়ী, গরমের রাতে আবু আফাক বাড়ির আঙিনায় ঘুমিয়ে ছিলেন; সালিম তার কলিজায় তলোয়ার রেখে এমনভাবে চাপ দেন যে তা বিছানা পর্যন্ত পৌঁছে যায় (সিরাত ইবনে ইসহাক, পৃ. ৬৭৫; তাবাকাত, খণ্ড ২, পৃ. ৩০–৩১)।

আসমা বিনতে মারওয়ান: সন্তানদের মাঝে নিহত মা

আসমা বিনতে মারওয়ান ছিলেন মদিনার একজন নারী কবি। ইবনে ইসহাক তাকে বনু উমাইয়া ইবনে যায়েদ গোত্রের সদস্য এবং ইয়াজিদ ইবনে যায়েদ আল-খাতমির স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন, অর্থাৎ তিনি ইহুদি নন, মদিনার আওস গোত্রীয় আরব। আবু আফাক নিহত হওয়ার পর তিনি কবিতায় মদিনাবাসীকে ধিক্কার দেন, কারণ তারা এক বহিরাগতকে নিজেদের নেতা মেনে নিয়েছে।
ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় মুহাম্মদ বলেন, “কে আমাকে মারওয়ানের মেয়ের হাত থেকে রেহাই দেবে?” ওয়াকিদি ও ইবনে সা’দ আরেকটি তথ্য যোগ করেন: আসমার নিজ গোত্রের অন্ধ (বা ক্ষীণদৃষ্টি) সাহাবি উমাইর ইবনে আদি মানত করেছিলেন, মুহাম্মদ বদর থেকে নিরাপদে ফিরলে তিনি আসমাকে হত্যা করবেন।

রাতে উমাইর আসমার ঘরে ঢোকেন। তার সন্তানেরা চারপাশে ঘুমিয়ে ছিল, একটি শিশু বুকের দুধ খাচ্ছিল। উমাইর হাতড়ে শিশুটিকে সরিয়ে দেন, তারপর আসমার বুকে তলোয়ার এমনভাবে বিঁধিয়ে দেন যে তা পিঠ ভেদ করে বেরিয়ে যায়। ভোরে ফজরের নামাজের পর মুহাম্মদ জিজ্ঞেস করেন, “তুমি কি মারওয়ানের মেয়েকে হত্যা করেছ?” উমাইর হ্যাঁ বলে জানতে চান, এর জন্য তার কোনো দায় আছে কি না। মুহাম্মদের উত্তর: “এ নিয়ে দুটি ছাগলও শিং ঠোকাঠুকি করবে না”, অর্থাৎ এই মৃত্যুর কোনো পরিণতি নেই, কেউ প্রতিশোধ চাইবে না। ইবনে সা’দের বর্ণনায়, কেউ উমাইরকে “অন্ধ” বললে মুহাম্মদ বলেন, তাকে অন্ধ নয়, “বাসির” (দৃষ্টিমান) বলো (সিরাত ইবনে ইসহাক, পৃ. ৬৭৫–৬৭৬; তাবাকাত, খণ্ড ২, পৃ. ৩০–৩১)।

কা’ব ইবনুল আশরাফ: অনুমোদিত প্রতারণা

কা’ব ইবনুল আশরাফ ছিলেন মদিনার প্রভাবশালী কবি ও ধনী ব্যক্তি; তার বাবা ছিলেন তাঈ গোত্রের আরব, মা বনু নাদির ইহুদি গোত্রের। বদর যুদ্ধে কুরাইশ নেতাদের মৃত্যুর পর তিনি মক্কায় গিয়ে তাদের জন্য শোকগাথা রচনা করেন ও প্রতিশোধে উস্কানি দেন; মদিনায় ফিরে মুসলিম নারীদের নিয়ে প্রেমের কবিতাও লেখেন (সিরাত ইবনে ইসহাক, পৃ. ৩৬৪–৩৬৫)।

সহিহ বুখারি (৪০৩৭; আরও ২৫১০, ৩০৩১, ৩০৩২) এবং সহিহ মুসলিমে (১৮০১) বর্ণিত হয়েছে, মুহাম্মদ বলেন: “কা’ব ইবনুল আশরাফের দায়িত্ব কে নেবে? সে আল্লাহ ও তার রাসুলকে কষ্ট দিয়েছে।” মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা জিজ্ঞেস করেন, “আপনি কি চান আমি তাকে হত্যা করি?” উত্তর আসে, “হ্যাঁ।” তখন ইবনে মাসলামা বলেন, “তাহলে আমাকে কিছু কথা বলার অনুমতি দিন”, অর্থাৎ কা’বের বিশ্বাস অর্জনের জন্য মুহাম্মদের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলার অনুমতি। মুহাম্মদ বলেন, “বলো।”

পরিকল্পনা অনুযায়ী ইবনে মাসলামা কা’বের কাছে গিয়ে অভিযোগ করেন, “এই লোকটি” সদকা চেয়ে চেয়ে তাদের কষ্টে ফেলেছে, এবং খাদ্যশস্য ধার চান। জামানত হিসেবে অস্ত্র বন্ধক রাখার প্রস্তাব দেন, যাতে রাতে সশস্ত্র অবস্থায় আসা সন্দেহজনক না হয়। রাতে তিনি আসেন আবু নায়েলাকে নিয়ে, যিনি ছিলেন কা’বের দুধভাই; সঙ্গে ছিলেন আবু আবস ইবনে জাবর, হারিস ইবনে আওস ও আব্বাদ ইবনে বিশর।

কা’বের স্ত্রী সতর্ক করেছিলেন, তিনি এমন এক কণ্ঠ শুনছেন যেন তা থেকে রক্ত ঝরছে। কা’ব জবাব দেন, সম্মানিত মানুষকে রাতে বর্শার আঘাতের জন্য ডাকা হলেও সে সাড়া দেয়। কা’ব নেমে এলে ইবনে মাসলামা তার সুগন্ধির প্রশংসা করে মাথার ঘ্রাণ নেওয়ার অনুমতি চান, তারপর চুল শক্ত করে ধরে সঙ্গীদের বলেন, “আঘাত করো” এবং তারা তাকে হত্যা করে। এরপর তারা ফিরে এসে মুহাম্মদকে খবর দেন। ইবনে সা’দের বর্ণনায় আরও আছে, তারা কা’বের কাটা মাথা মুহাম্মদের সামনে ফেলে দেন এবং তিনি হত্যার জন্য আল্লাহর প্রশংসা করেন।

পরদিন সকালের বর্ণনা আরও উদ্বেগজনক। ইবনে ইসহাক লিখেছেন, মুহাম্মদ ঘোষণা দেন: “ইহুদিদের মধ্যে যাকেই তোমরা হাতের কাছে পাও, হত্যা করো।” এরপর মুহাইয়িসা ইবনে মাসউদ নামে এক সাহাবি ইবনে সুনাইনা নামের এক ইহুদি ব্যবসায়ীকে হত্যা করেন, যার সঙ্গে তার ব্যবসায়িক ও সামাজিক সম্পর্ক ছিল (সিরাত ইবনে ইসহাক, পৃ. ৩৬৯)।

আবু রাফে: মর্যাদার প্রতিযোগিতায় হত্যা

আবু রাফে সাল্লাম ইবনে আবিল হুকাইক ছিলেন বনু নাদির গোত্রের নেতা ও ধনী ব্যবসায়ী, যিনি মদিনা থেকে বিতাড়নের পর খায়বারের দুর্গে বাস করতেন। সহিহ বুখারিতে (৪০৩৯; আরও ৩০২২, ৩০২৩, ৪০৩৮, ৪০৪০) বলা হয়েছে, তিনি মুহাম্মদকে কষ্ট দিয়েছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে শত্রুদের সাহায্য করতেন।

ইবনে ইসহাক এই হত্যার একটি চমকপ্রদ প্রেক্ষাপট দিয়েছেন। মদিনার দুই আনসার গোত্র আওস ও খাযরাজ মুহাম্মদের কাছে মর্যাদা অর্জনে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করত। আওস গোত্রের লোকেরা কা’বকে হত্যা করায় খাযরাজ গোত্রও সমান কৃতিত্ব চাইল; কা’বের মতো শত্রুতা আর কার আছে খুঁজে তারা আবু রাফের নাম পেল এবং মুহাম্মদের অনুমতি নিল (সিরাত ইবনে ইসহাক, পৃ. ৪৮২–৪৮৩)।

বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী আবদুল্লাহ ইবনে আতিকের নেতৃত্বে একটি দল খায়বারে যায়। সন্ধ্যায় আবদুল্লাহ কাপড়ে নিজেকে ঢেকে প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারার ভান করে দুর্গ-ফটকের কাছে বসে থাকেন; দারোয়ান তাকে দুর্গের লোক ভেবে ভেতরে ডেকে নেয়। (আরেকটি বর্ণনায় দুর্গের লোকেরা হারানো গাধা খুঁজতে বের হলে তিনি তাদের দলে মিশে যান।) রাতে তিনি খুঁটিতে ঝোলানো চাবি নিয়ে একটির পর একটি দরজা খোলেন এবং পেছন থেকে বন্ধ করে দেন, যাতে কেউ সাহায্যে আসতে না পারে।

অন্ধকার ঘরে তিনি “আবু রাফে” নাম বলে ডাকেন এবং আঘাত করেন। তারপর সেই হত্যাকারী সাহায্যকারীর ভান ধরে আবু রাফের কাছে যান এবং আহত আবু রাফেকে শনাক্ত করে আবার আঘাত করেন। শেষে তলোয়ারের ডগা পেটে ঢুকিয়ে পিঠ পর্যন্ত চাপ দেন।

অন্ধ ব্যক্তির দাসী: “তার রক্ত মূল্যহীন”

এই ঘটনাটি এসেছে সুনানে আবু দাউদ (৪৩৬১) ও সুনানে নাসাঈ (৪০৭০) থেকে, ইকরিমার সূত্রে ইবনে আব্বাসের বর্ণনায়; এক অন্ধ ব্যক্তির একজন উম্মে ওয়ালাদ ছিল, অর্থাৎ এমন দাসী, যে তার মালিকের সন্তানের মা। এই নারী মুহাম্মদকে গালি দিতেন ও নিন্দা করতেন; মালিক বারবার নিষেধ করলেও তিনি থামেননি।

এক রাতে তিনি আবার নিন্দা শুরু করলে অন্ধ লোকটি একটি ছোরা নিয়ে তার পেটে রাখেন এবং ভর দিয়ে চেপে তাকে হত্যা করেন। হাদিসের ভাষায়, এরপর তার দুই পায়ের মাঝে একটি শিশু পড়ে যায় এবং সেখানে সবকিছু রক্তে মাখামাখি হয়ে যায়। বর্ণনা থেকে স্পষ্ট যে নারীটি গর্ভবতী ছিলেন।

পরদিন মুহাম্মদ লোকজন জড়ো করে বলেন, যে এই কাজ করেছে সে যেন দাঁড়ায়। অন্ধ লোকটি কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে বলেন, তিনিই তার মালিক; সে নবীকে গালি দিত, নিষেধ মানত না; তার গর্ভজাত মুক্তোর মতো দুটি ছেলে আছে, আর সে তার প্রতি সদয় ছিল। মুহাম্মদ বলেন: “সাক্ষী থাকো, তার রক্ত মূল্যহীন (হাদার)।” অর্থাৎ হত্যাকারীর কোনো শাস্তি হবে না, কোনো রক্তমূল্যও দিতে হবে না।

সুনানে আবু দাউদের পরের হাদিসেই (৪৩৬২) আলি ইবনে আবু তালিবের সূত্রে একই ধরনের আরেকটি ঘটনা আছে: এক ইহুদি নারী মুহাম্মদকে গালি দিতেন, এক ব্যক্তি তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে, এবং মুহাম্মদ তার রক্তও মূল্যহীন ঘোষণা করেন।

উপসংহার

ঘটনাগুলোতে একটি সুস্পষ্ট ধারা দেখা যায়, কথা বা কবিতার মাধ্যমে সমালোচনা, তার জবাবে গোপন হত্যা, এবং মুহাম্মদের আগাম নির্দেশ বা পরবর্তী অনুমোদন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন বৃদ্ধ, নারী, মা ও দাসী; পদ্ধতি ছিল ছলনা, মিথ্যা ও ঘুমন্ত মানুষের ওপর আক্রমণ; আর কোনো ক্ষেত্রেই বিচার হয়নি।

যাকে সর্বকালের নৈতিক আদর্শ বলে দাবি করা হয়, তার আচরণ অনুসারীদের জন্যও আদর্শ হয়ে ওঠে, ধ্রুপদি আলেমরা ঠিক সেভাবেই এই ঘটনাগুলো পড়েছেন, আর আজকের ঘাতকরাও সেভাবেই পড়ে।

তাই প্রশ্নটি কেবল ইতিহাসের নয়। মুক্ত মত প্রকাশ, ন্যায্য বিচার এবং প্রতিটি মানুষের জীবনের সমান মূল্য, এই মৌলিক নীতিগুলোর সঙ্গে এমন কোনো নৈতিক কাঠামো সহাবস্থান করতে পারে না, যা সমালোচনার জবাবে তলোয়ারকে বৈধতা দেয়। ধর্ম অবমাননার নামে হত্যা বন্ধ করতে হলে প্রথমে এই নজিরগুলোর নৈতিক বৈধতাকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হবে।

Posted in

Leave a Reply

Discover more from নাস্তিক বাংলা

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading